‘আজি এ প্রভাতে রবির কর....
একদিন খুব সকালে, মাঘ মাস হবে হয়তো, বেশ জাঁকিয়ে বসা শীতের সকালে বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির পাশের একটি
তিন তলা দালানের প্রাথমিক বিদ্যাপীঠে, যেটা আদতে ‘সাইক্লোন সেন্টার’ হিসেবে কাজে লাগে প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা
ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে। ছোট্ট সেই দালান আমার
কাছে রহস্যময় ও অনতিক্রম্য স্থাপনা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল, দৈত্যকার সেই দালানের প্রতিটা সিড়ি অতিক্রম করতে আমার ছোট্ট পদযুগলের
বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল, বাবার ধ’রে রাখা শক্ত
হাত আমার সেই ভীরু পায়ে যোগাচ্ছিল অপরিসীম শক্তি। এই তিন তলা দালানটি আমার প্রথম বিদ্যালয়। এখানে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের শুরু।
যাইহোক, অবশেষে দোতলার প্রধান
শিক্ষকের ঘরে প্রবেশ করলাম। দুরু
দুরু বুকে এক অদ্ভূত ভয় বিরাজ করছিল, কিন্তু মনের অলিন্দে
অনুভূত হচ্ছিল অন্যরকম ভালোলাগাও। আমি
আজ থেকে এই স্কুলের ছাত্র হবো, হঠাৎ অনুভব করলাম আজ
থেকে আমি আর ছোট্টটি থাকবো না, একা একা স্কুলে আসবো, হাতে থাকবে বই, পকেটে কলম, আচড়ানো চুল আর পরিপাটি পোশাকে আমাকে নিশ্চয় খুব সুন্দর লাগবে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করবো, অনেক বড় হবো, বাবা-মা আমার সাফল্যে
নিশ্চয় অনেক খুশি হবে।
‘অ- তে অজগর আসছে তেড়ে....’
যদিও বাড়িতে বর্ণমালার পাঠ নিয়েছিলাম, নামতা শিখেছিলাম কিছু, গুণতে পারতাম, যোগ-বিয়োগ করতে পারতাম
ছোট ছোট সংখ্যা দিয়ে, অনেকাংশে সেইগুলোর
পুনরাবৃত্তি ঘটত বিদ্যালয়ের পাঠে। সুর
করে নামতা পড়তাম স্কুল ছুটির পরপরই, সবাইকে লাইন করে দাঁড় ক’রে
দিত স্কুলের ছোট্ট মাঠে, আর আমারা গলা উঁচুতে
তুলে সেই নামতায় সুর মেলাতাম। সকাল
বেলায় জাতীয় সঙ্গীত ‘ আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, আর স্কুল শেষে সুর ক’রে
নামতা পড়ার স্মৃতি ‘তিন একে তিন, তিন দু গুণে ছয়’ আজো মানসপটে ভেসে ওঠে। বর্ণমালার বই সম্ভবত সীতানাথ বসাকের ‘আদর্শ লিপি’ পড়েছিলাম আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণ পরিচয়’ এর সাথে পরিচয় হয়েছিল। তখন অনেকের ঘরে শিশুদের পাঠের জন্য এই বইগুলো
থাকত। যাইহোক আমি স্কুলে শিশু শ্রেণীর জন্য রচিত ‘আমার বই’ দিয়ে বিদ্যালয়ের পাঠ শুরু করেছিলাম।