সুচরিতাষু,
ভেবেছিলাম খুব আবেগ দিয়ে অনুভূতি দিয়ে একটা
প্রেমপত্র লিখবো। কিন্তু লিখতে বসে বুঝতে পারলাম কৌশোরের যে অদম্য ও তীব্র প্রেমের
অনুভুতি সেটাতে অনেক পরিপক্কতা এসেছে। আগের মত আর আবগে এসে ঝাপ্টে ধরে না, বরং আসে
ধীরে ধীরে।
খুব সুস্থিরভাবে নিজের মনের সাথে কথা বলে। অল্প- বয়সের যে বালখিল্য-স্বভাব তা আর স্বতস্ফুর্তভাবে ফুটে ওঠে না। এটা নিয়ে কোনো দুঃখ নেই, বরং বুঝতে পারি এটা সময়ের দাবি। সময় আমাদের নশ্বর শরীরে দাগ কেটে দিয়ে যায়।
খুব সুস্থিরভাবে নিজের মনের সাথে কথা বলে। অল্প- বয়সের যে বালখিল্য-স্বভাব তা আর স্বতস্ফুর্তভাবে ফুটে ওঠে না। এটা নিয়ে কোনো দুঃখ নেই, বরং বুঝতে পারি এটা সময়ের দাবি। সময় আমাদের নশ্বর শরীরে দাগ কেটে দিয়ে যায়।
ভালোবাসা এসেছিল জীবনে বিভিন্ন সময়ে
বিভিন্নভাবে। মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র কারণ এই ভালোবাসার অনুভূতিটা
এত তীব্রভাবে প্রাণিজগতের অন্যরা প্রকাশ করতে পারে না, কিংবা হয়তো পারে, আমরা জানি
না। আমরা শুধু জানি ভালবাসার রকমফের আছে।
বিচিত্র রকমের ভালোবাসায় রঙিন এই পৃথিবী। এই পৃথিবীর
প্রায় সব মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময় ভালোবাসার আর প্রেমের গান গায়,
ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকে সদা-সর্বদা। কারো জন্য এই প্রেম-ভালোবাসা খণ্ডকালীন
নয়, বরং কেউ কেউ আমৃত্যু বুকের ভেতর
প্রবাহিত হতে দেন ভালোবাসার এই ফল্গুধারা। আমি জানি এইটুকু পর্যন্ত পড়ে তোমার কপালে
একটা বিরক্তির ভাঁজ পড়বে। একটা রোমান্টিক চিঠি পড়তে বসে এইরকম একটা রসকষহীন লেখা
কারো ভালো লাগার কথা না। থরোথরো প্রেমের আকুলতা যেখানে প্রকাশ পাবার কথা সেখানে এই
তত্ত্বকথা কাঁহাতক ভালো লাগে!
ভেবেছিলাম অনেক কথা বলবো, যে-সব কথা বলা হয়
নি কখনো। আমার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের সেই উচ্ছল দিনগুলোর কথা। একটা সময় ছিলো যখন
সব কিছুকে অদ্ভূত রঙিন চশমার মধ্য দিয়ে দেখতাম। পৃথিবীটা অনেক রঙিন ছিল সেই সময়।
পৃথিবীর এই রঙকে আমি এখনো হারাতে দেই নি। পৃথিবী আজো বর্ণিল আমার কাছে। জীবনের শেষ
দিন পর্যন্ত যেন এই রঙ আমার মানসপটে লেপ্টে থাকে। অনেক দুঃখ-কষ্টও খুব সহজে আমাকে কাতর ও হতাশ করতে পারে নি। আজো জীবন নানা
অপূর্ণতা স্বত্বেও খুব মধুর ও প্রার্থনীয় আমার কাছে। জীবনকে সবসময় ভরপুর রাখতে চেয়েছিলাম, আর
চেয়েছিলাম জগতের আনন্দযজ্ঞে বিচরণ করতে।
আনন্দের সংজ্ঞা আমার কাছে একটু ব্যতিক্রম,
হয়তো অন্য সবাই যাতে আনন্দ পায়, আমি তাতে না বরং অন্য কিছুতে আনন্দ পায়। অনেক টাকা
থাকবে, অনেক ধনী হবো, বা মন যা চাইবে তা সাথে সাথে পেয়ে যাবো এই স্বপ্ন আমি কখনো
দেখি না। বরং কষ্ট স্বীকার করে সব কিছু অর্জন করার মধ্যে প্রকৃত সুখ নিহিত আছে এই
মতবাদে বিশ্বাস করি। তবে কিছু বিষয়ে আমি হয়তো ছাড় দিতে চাইবো না, সেটা হলো আমি
প্রতিদিন একান্ত কিছু সময় চাইবো আমার পড়া-শুনার জন্য, গান-শুনার জন্য, চলচ্চিত্র
দেখার জন্য, আর সে-ক্ষেত্রে যদি পেয়ে যাই মনের মত একজন সঙ্গী- তাহলে ভালো লাগা হবে
দ্বিগুনতর।
মাঝে মাঝে হয়তো ভ্রমণের নিমিত্তে বেরিয়ে পড়তে চাইবো, যদি পরিকল্পনা করে বের হই, বেশ
সুন্দর হবে কিন্তু যদি হয় সেটা পরিকল্পনাহীন আমার ধারণা তা হবে সুন্দরতর। এই স্বভাবগুলো যদি হারিয়ে ফেলি তা হলে অন্য সবার মত গৃহপালিত প্রাণী হয়ে যাবো, তাতে যে আমার খুব ক্ষতি যাবে তা হয়তো নয় তবে এতে আমার স্বাভাবিক আত্মাটা
মরে যাবে - সুন্দরভাবে ভাবে বাঁচা বা বাঁচার মত বাঁচার জন্য যে প্রাণ রস আহরণ করা দরকার তা সংগ্রহে বিঘ্ন
ঘটবে হয়তোবা।
ব্যক্তিগত কথা এসে যাচ্ছে অনেক, হয়তো এ সবের
প্রয়োজনীয়তা নেই খুব একটা, কিন্তু এ-সব আমরা সাধারণত প্রিয় কোনো মানুষ ছাড়া অন্য
কারো সাথে শেয়ার করি না, শেয়ারের দরকারও পড়ে না। সেই অর্থে এটার একটা ইতিবাচক দিক
আছে, নিজেকে তুলে ধরার মত নির্ভরশীল কেউ
একজন আমার আছে – এ-ভাবনা নিজের ভেতর একটা ভালোলাগার অনুভূতি তৈরি করে সবসময়। কোনো একদিন
তোমার আত্মবিশ্লেষণমুলক কোনো চিঠি হয়তো আমি পেয়ে যাবো, তোমার প্রাণখোলা কথার সৌরভে
সে চিঠি মৌ মৌ করবে, সেটা অবশ্যই আমার জন্য হবে একটা বিশাল পাওয়া।
দ্বিতীয় প্যারায় উল্লিখিত আমার ‘জীবনে
বিভিন্ন ধরনের প্রেম এসেছিল’ পড়ে তোমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। সেটা
পরিষ্কার করে বলা সহজ, কিন্তু তবুও হয়তো বুঝতে কঠিন হবে। আমি ছোট বেলা থেকে কিছুটা
সংবেদনশীল, একা একা থাকতে পছন্দ করতাম। আঁকার হাত খুব ভালো ছিল, চারুকলায় পড়ার খুব
স্বপ্ন ছিল, বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত আর সে পথে যেতে পারি নি। গল্পের বই পড়তাম,
পড়ার অদ্ভুত নেশা ছিল, হাতের কাছে যা পেতাম পড়তাম, খেলাধুলাও করতাম, তবে
অন্যবালকের তুলনায় সেটা খুবই কম। কারণ আমার নিজস্ব একটা জগত ছিল, ছিল এক অদ্ভুত
কল্পনার রাজ্য। সেই রাজ্যে আমিই একমাত্র রাজা। আর চারপাশের প্রকৃতি, মানুষকে আমার
কল্পনার মত করে সাজিয়ে নিতাম।
আমার এই ভাবনাগুলো প্রকাশ করার জন্য ভালো হতো একটা কবিতার আশ্রয় নিলে কেমন
হয়? কবিতা একসময় আসতো এক-আধটু, কিন্তু কবিতা শিল্পের এমন একটা ফর্ম যেটা সবাইকে
ধরা দেয় না, কবির হওয়ার জন্য যে আত্মবিধ্বংসী প্রাণ দরকার সেটা আমার নেই, থাকলে
আমি অন্য কিছু হতাম। অন্য কোনো জগতে থাকতাম, তোমার সাথে হয়তো পরিচয়ই হতো না, পরিচয়
হলেও হয়তো দু-জন এক ছাদের নিচে থাকার কোনো পরিকল্পনাই করতাম না। আমার এই চিঠিটি আজ
শেষ করবো না, আমার ইচ্ছা আছে কমপক্ষে আরো একটা পর্ব লেখার। দ্বিতীয় পর্বে যদি মনে হয়
আমার অনেক না-বলা কথা রয়ে গেছে তাহলে হয়তো আরেকটা পর্ব আসবে। যাই হোক সেটা সময়ই
বলে দেবে। আজ একটা কবিতা দিয়ে এখানে ইতি টানতে চাই।
কথোপকথন – ২৮
পূর্ণেন্দু
পত্রী
- আমার আগে আর কাউকে ভালোবাসনি তুমি?
- কেন বাসব না? অনেক।
কৃষ্ণকান্তের উইলের ভ্রমর
যোগাযোগের কুমু
পুতুলনাচের ইতিকথার কুসুম
অপরাজিত –র
- ইয়ার্কি করো না। সত্যি কথা বলবে?
- রোগা ছিপছিপে যমুনাকে ভালোবেসেছিলাম বৃন্দাবনে
পাহাড়ী ফুলটুংরীকে ঘাটশীলায়
দজ্জাল যুবতী তোর্সাকে জলপাইগুড়ির জঙ্গলে
আর সেই বেগমসাহেবা, নীল বোরখায় জরীর কাজ
নাম চিল্কা
- আবার বাজে কথার আড়াল তুলছ?
- বাজে কথা নয়। সত্যিই।
এদের কাছ থেকেই তো ভালোবাসতে শেখা।
অনন্ত দুপুরে একটা ঘাস ফড়িং-এর পিছনে
এক একটা মাছরাঙার পিছনে গোটা বাল্যকাল
কাপাসতুলো ফুটছে
সেইদিকে তাকিয়ে দুটো তিনটে শীত–বসন্ত।
এইভাবেই তো শরীরের খাল–নালায়
চুইয়ে চুইয়ে ভালোবাসার জল।
এইভাবে তো হৃদয়বিদারক বোঝাপড়া।
কার আদলে কী, আর কোনটা মাংস, কোনটা কস্তুরী গন্ধ।
ছেলেবেলায় ভালোবাসা ছিল
একটা জামরুল গাছের সঙ্গে।
সেই থেকে যখনই কারো দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই
জামরুলের নিরপরাধ স্বচ্ছতা ভরাট হয়ে উঠেছে
গোলাপি আভার সর্বনাশে,
অকাতর ভালোবেসে ফেলি তত্ক্ষনাৎ
সে যদি পাহাড় হয়, পাহাড়
নদী হয়, নদী
কাকাতুয়া হলে, কাকাতুয়া
নারী হলে, নারী ।
==========
ভালো থেকো, সুন্দর থেকো।
**************
বুনিয়া, ডি আর কঙ্গো
১৬ অক্টোবর ২০১৩ খ্রিঃ
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন