আফ্রিকা-বাসের বিশেষ করে কঙ্গো-বাসের
সময় সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল যে জিনিসটি সেটা হলো সেখানকার আবহাওয়া। এত অসাধারণ
ভালো-লাগার প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব বেশি জায়গায় মিলবে না। চীনের কুনমিং
এ-ধরনের পরিবেশ পেয়েছিলাম, এ-শহরটিকে চির
বসন্তের শহর নামে আখ্যায়িত করা হয়। বুনিয়া বা ইতুরি কিংবা আরো ব্যাপকভাবে
বললে ওরিয়েন্টাল প্রদেশ-কে চির-বসন্তের নামে আখ্যায়িত করার তথ্য কোথাও
পায় নি। যদিও আবহাওয়া তথাকথিত চিরবসন্তের স্থানগুলোর চেয়ে কোনোভাবেই অশ্রেয়তর
বলা যাবে না।
বই-পুস্তকে ঐ অঞ্চলের
জলবায়ু বা আবহাওয়া সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, সে-সব তথ্য ঘাটার সুযোগ হয় নি, কিংবা তেমন দরকারও বোধ করি নি। টানা তিন বছর এক
এলাকায় বাস করার কারণে সেখানকার আবহাওয়া জানার জন্য বইয়ের তথ্যের খুব
দরকার আছে বলে মনে হয় নি। তবে জলবায়ুর যে বৈশ্বিক পরিবর্তন প্রতিনয়ত পরিলক্ষিত
হচ্ছে, তাতে
আমার দেয়া তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা হয়তো বেশিদিন স্থায়ী নাও
হতে পারে। কাজেই রেফারেন্স হিসেবে বিবেচনা করতে চাইলে আমার বলা কথাগুলোকে ‘২০১০
থেকে ২০১৩ সালের মধ্যকার সময়ে ইতুরি অঞ্চলের আবহাওয়াঃ একজন প্রত্যক্ষদর্শী-র বিবরণ’
হিসেবে সাব্যস্ত করলে সাচ্ছন্দ্যবোধ করবো।
প্রধানত তিনটি ঋতুর কথা বলা হয়ে থাকলেও আমি মোটা-দাগে দুটি ঋতুর অস্থিত্ব উপলব্দি করতে পেরেছি। তাও খুব বেশি পার্থক্য আছে বলা যাবে না। স্থানীয়-রা শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিনটা সময়কালের মধ্যে পুরো বছরটিকে ভাগ করেন। আমার কাছে যদিও বর্ষা আর শীত-টাই আলাদা করার মত মনে হয়েছে। এখানে সাধারণত সারা বছরই বৃষ্টিপাত হয়। তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৫ এর মধ্যে থাকে সাধারণত। পুরো অঞ্চলটি পাহাড়ী এলাকা। বুনিয়া, বগোরো, আভেবা এই এলাকাগুলো কিছুটা উঁচু, সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ৩০০০/৪০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। মাঝে মাঝে কিছু এলাকা মেঘে ঢেকে ফেলে আমাদের বান্দরবানের নীলগিরি-র এলাকার মত। সে-এক অপূর্ব দৃশ্য!
এই অঞ্চলে হিউমিডিটি বেশি হওয়ায় গায়ে ঘাম হয় না বললেই চলে। অনেকক্ষণ দৌঁড়ানোর পরও আমাদের গায়ে হালকা চিকন ঘাম হতো যা বেশ অবাক করত আমাদের মত বাংলাদেশিদের। আর বৃষ্টি হওয়া মাত্রই তাপমাত্রা কমে যেত অনেক। সেই মৃদু শীত এত উপভোগ্য ছিল যে আমরা সবাই বলাবলি করতাম ইশ এই ধরনের আবহাওয়ায় যদি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম। পাহাড়ী এলাকা, মাটি লাল আর চারদিক সবুজ। মাটি উর্বর, মাঝে মাঝে পাহাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণা। এ-ছাড়াও আছে পৃথিবী বিখ্যাত হ্রদ 'লেক আলবার্ট'। এখানে বৃষ্টি-র সাথে মাঝে মাঝে শিলা পড়ে, শিলাবৃষ্টি-র সবচেয়ে বড় ও তীব্র অভিজ্ঞতাটি আমি পেয়েছি এই অঞ্চল থেকে।এখানে বজ্রপাত হয় অনেক। প্রতিবছর অনেক মানুষ প্রাণ হারায় এই বজ্রপাতে। ভূমিকম্প হয়েছিল দুয়েক-বার তবে বেশ মৃদু। কঙ্গো-র উত্তর পূর্বাঞ্চলে আছে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। নাম নিয়ারাগঙ্গো। আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি, কারণ নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল যাতায়ত। আমার কিছু সহকর্মী ঘুরে এসেছিলেন সে এলাকা। সে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা। না যেতে পারার বেদনা আমাকে বাকি জীবন পোড়াবে!
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রেইন ফরেস্ট ইপুলু দেখার সুযোগ হয়েছিল, গভীর বনে যেতে না পারলেও হেলিকপ্টারে করে একাধিকবার ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছিল এই গহীন ও বিশাল জঙ্গলের উপর দিয়ে। দেখেছিলাম পৃথিবীর অন্যতম খর্বকায় উপজাতি পিগমি ইত্যাদি। এছাড়াও জানার সুযোগ হয়েছে মোম্বাসা-র বিখ্যাত প্রাণী ওকাপি সম্পর্কে। জীব বৈচিত্রে ভরা এত চমৎকার স্থান পৃথিবীতে আসলেই দূর্লভ। যুদ্ধ-বিগ্রহ, দাঙা-হাঙ্গমা না থাকলে এটি পৃথিবী-তে একটি আদর্শ স্থান হিসেবে পরিগণিত হতে পারত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন