‘আজি এ প্রভাতে রবির কর....
একদিন খুব সকালে, মাঘ মাস হবে হয়তো, বেশ জাঁকিয়ে বসা শীতের সকালে বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন বাড়ির পাশের একটি
তিন তলা দালানের প্রাথমিক বিদ্যাপীঠে, যেটা আদতে ‘সাইক্লোন সেন্টার’ হিসেবে কাজে লাগে প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা
ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে। ছোট্ট সেই দালান আমার
কাছে রহস্যময় ও অনতিক্রম্য স্থাপনা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল, দৈত্যকার সেই দালানের প্রতিটা সিড়ি অতিক্রম করতে আমার ছোট্ট পদযুগলের
বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল, বাবার ধ’রে রাখা শক্ত
হাত আমার সেই ভীরু পায়ে যোগাচ্ছিল অপরিসীম শক্তি। এই তিন তলা দালানটি আমার প্রথম বিদ্যালয়। এখানে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের শুরু।
যাইহোক, অবশেষে দোতলার প্রধান
শিক্ষকের ঘরে প্রবেশ করলাম। দুরু
দুরু বুকে এক অদ্ভূত ভয় বিরাজ করছিল, কিন্তু মনের অলিন্দে
অনুভূত হচ্ছিল অন্যরকম ভালোলাগাও। আমি
আজ থেকে এই স্কুলের ছাত্র হবো, হঠাৎ অনুভব করলাম আজ
থেকে আমি আর ছোট্টটি থাকবো না, একা একা স্কুলে আসবো, হাতে থাকবে বই, পকেটে কলম, আচড়ানো চুল আর পরিপাটি পোশাকে আমাকে নিশ্চয় খুব সুন্দর লাগবে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করবো, অনেক বড় হবো, বাবা-মা আমার সাফল্যে
নিশ্চয় অনেক খুশি হবে।
‘অ- তে অজগর আসছে তেড়ে....’
যদিও বাড়িতে বর্ণমালার পাঠ নিয়েছিলাম, নামতা শিখেছিলাম কিছু, গুণতে পারতাম, যোগ-বিয়োগ করতে পারতাম
ছোট ছোট সংখ্যা দিয়ে, অনেকাংশে সেইগুলোর
পুনরাবৃত্তি ঘটত বিদ্যালয়ের পাঠে। সুর
করে নামতা পড়তাম স্কুল ছুটির পরপরই, সবাইকে লাইন করে দাঁড় ক’রে
দিত স্কুলের ছোট্ট মাঠে, আর আমারা গলা উঁচুতে
তুলে সেই নামতায় সুর মেলাতাম। সকাল
বেলায় জাতীয় সঙ্গীত ‘ আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, আর স্কুল শেষে সুর ক’রে
নামতা পড়ার স্মৃতি ‘তিন একে তিন, তিন দু গুণে ছয়’ আজো মানসপটে ভেসে ওঠে। বর্ণমালার বই সম্ভবত সীতানাথ বসাকের ‘আদর্শ লিপি’ পড়েছিলাম আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণ পরিচয়’ এর সাথে পরিচয় হয়েছিল। তখন অনেকের ঘরে শিশুদের পাঠের জন্য এই বইগুলো
থাকত। যাইহোক আমি স্কুলে শিশু শ্রেণীর জন্য রচিত ‘আমার বই’ দিয়ে বিদ্যালয়ের পাঠ শুরু করেছিলাম।
স্কুলে যাওয়াটা খুব আনন্দের ছিল যদি না বাড়িতে বিশেষ কোনো আনন্দজনক
ঘটনা বা উৎসব-জাতীয় ব্যাপার থাকতো। বাড়ির
কাছেই ছিল স্কুল, ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত, অনেক সময় ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথে বাড়ি থেকে দৌড় লাগাতাম। স্যার শ্রেণীকক্ষে আসার আগে হাজির হয়ে যেতে পারতাম। স্কুলে যাওয়াটা বেশ উপভোগ্য ছিল, বিরতির সময় দৌড়-ঝাপ আর খেলাধুলা করার জন্য বেশ সুন্দর একটা মাঠ ছিল, অনেক প্রিয়মুখ ছিল, সহানুভূতিশীল সহপাঠী ছিল, হৃদয়বান শিক্ষক ছিল, আর ছিল ছোট্ট মনের মধ্যে
জানা ও শেখার এক অদম্য আগ্রহ ও প্রেরণা। জানি
না সেই ছোট্ট বয়সে এই অনুভূতি কীভাবে এসেছিল, তবে এসেছিল – বেশ মনে পড়ে। তৃতীয়
শ্রেণী-তে তৃতীয় হয়েছিলাম বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল অনুসারে, সেই থেকে দ্বিতীয় বা প্রথম হওয়ার একটা বাসনা মনের কোণে সঙ্গোপনে বাসা
বেঁধেছিল, যদিও আমার দুই মেধাবী সহপাঠী সেই সুযোগ আমাকে
কখনো দেয় নি।
‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাটশিশু
আনমনে......’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিনগুলো একভাবেই কেটে যাচ্ছিল। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সর্বসাকুল্যে শিক্ষক
ছিলেন ৪ জন। শিক্ষকেরা আমাদের
আশপাশের গ্রামের লোক। আমি পরপর দুইজন প্রধান
শিক্ষক-কে পেয়েছিলাম যারা আবার আমাদের আত্মীয় হতেন। সকালে স্কুল করতাম যখন প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীতে
পড়তাম। দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে
যেত। চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণীতে বৈকালিক পাঠ দান
প্রক্রিয়া চলতো। দুপুরে শুরু হতো, আর বিকেলে শেষ হত। বারটায়
আমাদের স্কুল শুরু হতো। মধ্যাহ্ন বিরতিতে আমি
বাড়িতে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে যেতাম। মোটামুটি
নির্বিঘ্ন ছিল আমার শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক পাঠ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অবৈতনিক, খাতা-কলম আর পরীক্ষার
সামান্য ফি ছাড়া তেমন খরচ ছিল না বললেই চলে। তবে
চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীতে এক অতি বদরাগী গণিত শিক্ষক পেয়েছিলাম। কারণে অকারণে গায়ে হাত তুলত। উনার কারণে আমার গণিতভীতি মাধ্যমিক পর্যন্ত বলবৎ
ছিল। পঞ্চম শ্রেণীর গণিত বইয়ে কিছু জ্যামিতিক চিত্র
থাকতোঃ বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, বিভিন্ন ধরনের কোণ, আয়তক্ষেত্র ইত্যাদি। আমার
ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার শখ ছিল; শিশুমনের খেয়ালে সেই
জ্যামিতিক চিত্রগুলো আমি রঙ-পেন্সিল দিয়ে ভরাট করে ফেলেছিলাম। স্যার বইয়ে এ অপ্রয়োজনীয় কাজ দেখে আমাকে বেদম
মেরেছিলেন। উনার হাতের পাঁচ আঙুলে
ছাপ আমার কচি গালে বেশ কয়েক দিন ফুটে ছিল। বেত
দিয়ে বেধরক পিঠুনিও দেয়াও ছিল উনার একটা সহজাত অভ্যাস।
স্কুলে দুইটি বিশেষ দিন আমাদের কাছে ভীষণ আনন্দদায়ক ও উৎসবমুখর ব’লে
প্রতীয়মান হতো। বছরের শুরুর দিন যেদিন
আমরা নতুন শ্রেণীর নতুন বই পেতাম আর যেদিন বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হতো। আমাদের সময়ে আমরা সবকয়টি বই নতুন হিসেবে পেতাম না। ছয়টি বইয়ের মধ্যে হয়তো তিনটি বা চারটি নতুন আর
বাকিগুলো বিগত বছরের শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত বই। আমি খুব সুন্দর ক’রে বই বাঁধতে পারতাম। পুরনো ক্যালান্ডারের পাতা দিয়ে বইগুলো-কে মুড়িয়ে
সেলাই ক’রে দিতাম। আমি নিজেরগুলো শেষ করে
বাড়ির স্কুল-পড়ুয়া অন্যদের বইগুলো বাধিঁয়ে দিতাম। উপরে সুন্দর করে রঙিন কলম দিয়ে নাম লিখে দিতাম। যখনি সু্যোগ পেতাম নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতাম। এ-এক অন্যরকম অনুভূতি! বাংলা বইয়ের প্রতি আমার
ছিল সীমাহীন দুর্বলতা। নতুন বই হাতে পাওয়ার
প্রথম কয়েকদিনের মধ্যে আমি বাংলা গদ্য ও পদ্যগুলো সোৎসাহে পাঠ করে ফেলতাম। বাংলা কবিতাগুলো বুকের একেবারে ভিতরে গিয়ে অনরণন
তুলত। চমৎকার সব কবিতা সম্পূর্ণ হয়তো অনুধাবন করতে পারতাম না, কিন্তু যেটুকু বুঝতে
পারতাম তাতেই কবিতা-ছড়াগুলো সব হৃদয়ে চিরদিনের জন্য গাঁথা হয়ে যেত।
তবে গণিতভীতি ক্রমশ আমাকে গ্রাস করে ফেলছিল। গণিত ছাড়া আর সব বিষয় আমাকে আনন্দ দিত, পড়ে ভালো লাগত। কিন্তু
গণিতের প্রতি আমার আগ্রহ ক্রমশ নিম্নগামী হ’তে থাকলো। এদিকে আমাদের স্বাধীনতার পরিসর ধীরে ধীরে বাড়তে
লাগলো। খেলাধুলা, গ্রামের আশেপাশে ঘুরেবেড়ানো, স্কুল ফাঁকি দেয়া এইগুলো
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে সুখকর ক’রে তুলছিল।
অবশেষে একদিন পঞ্চম শ্রেণীর ফলাফল নিয়ে বাড়ির পাশের প্রাথমিক
বিদ্যাপীঠের পাঠ শেষ করলাম। হাইস্কুলে
পড়তে যাব এই আনন্দে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার সময় তেমন কোনো বেদনা অনুভব করি
নি। তবে প্রাথমিকে পড়ার সময় দুটো ঘটনা মনে খুব দাগ
কেটেছিল, আমাদের এক সহপাঠীর মৃত্যু আর পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার
সময় আমাদের এক বান্ধবীর বাল্যবিবাহ ও স্কুল ত্যাগ।
মাধ্যমিকের দিকে যাত্রাঃ
আমাদের গ্রামে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। পাশের গ্রামে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটা
বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বেশ সকালে স্কুলের পথে
যাত্রা করতাম আর স্কুল শেষে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন সূর্য পশ্চিমাকাশের প্রায় শেষ
প্রান্তে চলে যেত। সকালে খাবার খেয়ে যেতাম, মাঝে মাঝে খেয়ে যাওয়ার সময় পেতাম না। বিরতিতে যেহেতু বাড়িতে আসা সম্ভব ছিল না, তাই দুপুরে প্রায়ই অভুক্ত থাকতাম। আমাদের স্কুলের পাশেই বেশ বড় একটা বাজার ছিল, ৩ থেকে ৫ টাকার মধ্যে ডাল আর তন্দুরের রুটি দিয়ে বেশ খাওয়া যেত। প্রতিদিন এই সামান্য কয়টা টাকা নিয়ে স্কুলে যাওয়া
আমার জন্য অনেক বড় বিলাসিতা ছিল, তবে মাঝে মধ্যে কোনো না
কোনো উৎস থেকে টাকা এসে যেত। মধ্যাহ্ন
বিরতিতে ক্ষুধার্থ পেটে সেই পাঁচ টাকার ডাল-রুটির স্বাদ কী যে অমৃত মনে হত তা
ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব বটে।
পড়ালেখার ব্যাপারে আমার বাবার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। তবে তার সাধ ও সাধ্যের মধ্যে নিরন্তর টানাপোড়ন
ছিল। আমরা প্রায় পাঁচ ভাই একই সাথে স্কুল-কলেজে পাঠরত
ছিলাম। একসাথে এতজনের পড়ালেখার
খরচ চালানো একজন পল্লী-চিকিৎসক বাবার জন্য দুঃসাধ্যই ছিল। প্রায়ই আমার স্কুলের বেতন বাকি পড়ে যেত, শ্রেণী-শিক্ষক প্রায়ই তাগদা দিতেন, সবার সামনে দাঁড় করিয়ে
বাক্যবাণে জর্জরিত করতেন। আমার কিশোর-মন বেদনা ও
গ্লানিতে কী যে ম্রীয়মান হয়ে যেত! সময়মত বেতন দিতে না পারার জন্য স্কুলে
অনুপস্থিত থাকাটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল। এই অনিময় আমার পুরো
শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করেছিল। ভালো
ছাত্র হিসেবে সুনাম থাকলেও দশম শ্রেণী পর্যন্ত গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া
স্বাভাবিক একটা ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। পারিবারিকভাবে
খুব বেশি স্বচ্ছল না হওয়ার কারণে প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে যাওয়াটা সম্ভব ছিল না। যদিও অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন সময়ে ইংরেজি বিষয়
পড়ার জন্য একজন শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু মাস দুয়েকের বেশি
আর চালিয়ে যেতে পারি নি নানাবিধ সমস্যার কারণে। যাইহোক, মাধ্যমিকে এসে চুড়ান্ত
পরীক্ষায় অংশগ্রহণের নিমিত্তে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পরীক্ষার বৈতরণী পার হলেও গণিতের
জন্য ভয়টা থেকেও যাচ্ছিল। অবশেষে স্কুলের একজন
শিক্ষকের কাছে গণিতের জন্য প্রাইভেটে পড়া শুরু করি। আমার গণিত ভীতি সেই থেকে প্রায় নেই বললেই চলে। গণিতের অনেক মৌলিক বিষয় আমি সেই সময় সেই শিক্ষকের
কাছে শিখেছিলাম।
আমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ছিল বেসরকারি। গ্রামের স্কুল হিসেবে কিছুটা নামঢাক ছিল। স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিলে অনেক। শিক্ষকের অভাব ছিল না তবে পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষকের
সংখ্যা বা পরিমাণ কম ছিল তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। মাধ্যমিকের সময়টা যে কোন শিক্ষার্থীর জন্য
গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি এই সময়টিকে
পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারি নি। খুব
গুরুত্বের সহিত পড়াশুনা শুরু করি মূলত মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত সময়টা বেশ হেসে
খেলে কাটিয়েছিলাম। এই সময়টা আরো
কার্যকরভাবে কাজে লাগালে হয়তো জীবনের গতি পালটে যেত। যাইহোক অসাধারণ কিছু শিক্ষক পেয়েছিলাম এই পর্বে। পেয়েছিলাম এমন কিছু সহপাঠী যারা পরবর্তী জীবনেও
আমার বন্ধু হিসেবে ছিল, আছে।
মাধ্যমিকে আমাদের সবার একটা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। অনেক কিছু আমরা ভাবতে শিখি। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বোধ তৈরি
হয়। বয়সটা আবার খুব সংবেদনশীলও। বয়ঃসন্ধির মত গুরুত্বপূর্ণ সময়টা আমাদের পার করতে
হয়। এই সময়টাকে ঠিকমত বাগে রাখতে না পারতে না পারলে জীবনটা তছনছ
হয়ে যায়। মন আছে, আমাদের অনেক সহপাঠীকে মাঝপথে হারিয়ে ফেলি। দারিদ্র্য অন্যতম একটা বাধা ছিল অনেকের জীবনে। টাকার অভাবে অনেকে মাঝপথে পড়াশুনা ছেড়ে দিত। পিতাকে মাঠের কাজে সাহায্য করার জন্য অনেকের
শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটত। অনেকে পারিবারিক ব্যবসায়
যোগ দিত। অনেকে পরিবারকে অর্থের
যোগান দেয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা অন্য কোথাও পাড়ি জমাত। আমার থেকে পাঁচ ছয় বছরের ছেলেরাও পড়ত। অনেকে মেয়ে শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে যেত। এখন যদিও অনেক অভিভাবকের চিন্তা-ভাবনার কিছুটা
পরিবর্তিন হয়েছ তথাপি প্রায়ই গ্রামের স্কুলগুলোতে এই ধরনের খবর আমারা পেয়ে থাকি। আমার অনেক মেধাবী বান্ধবী-কে হারিয়ে ফেলেছি। মাধ্যমিকে চমৎকার ফলাফল থাকা সত্ব্বেও ওরা আর
উচ্চ-মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারে নি। জনাকয়েক
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় নিয়োজিত আর অধিকাংশই গৃহবধু হিসেবে দিনাতিপাত করছে।
‘বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে….’
জন্মেছি এই বঙ্গে….’
মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী থাকাকালীন যে বিষয়টি আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল
তা হলো একুশের ফেব্রুয়ারি-র প্রভাতফেরি। প্রতি
একুশে ফেব্রুয়ারি-র ভোর বেলায় ফুলের মালা হাতে স্কুলে পৌঁছে যেতাম। শীতের কুয়াশায় আমরা দু’ভাই আর এক কাকাতো ভাই মিলে
তিন কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আমরা যখন স্কুলে হাজির হতাম তখন হয়তো ভোরের আলো একটু
একটু ক’রে ফুটছে। সেই আধো আলো অন্ধকারে
স্কুলের কয়েক জন শিক্ষকসহ আমরা প্রভাত ফেরি করতে গ্রামের মেঠো পথে বেরিয়ে পড়তাম
খালি পায়ে। হাতে থাকতো ফুল, ফুলের মালা। দুই সারিতে প্রায়
শ-খানেকের চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী। মাইকে
বাজতো ‘আমার ভাইয়ের ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে
ফেব্রুয়ারি’-র করুণ সুর। আমার হৃদয় এত আর্দ্র হতো সেই সুরে! গ্রামের
বিভিন্ন রাস্তায় আমরা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হেঁটে আবার স্কুলে ফিরতাম। শহীদ মিনারে ফুল দিতাম সারি বদ্ধ হয়ে। আরো অনেক যোগ দিত পথিমধ্যে। এতক্ষণ হাঁটার পরও এতটুকু ক্লান্তি বোধ হতো না। বরং সবাই যখন বাড়ি থেকে বের হ’য়ে দেখত আমাদের
মিছিলের সারি, এক অদ্ভূত ভালো লাগায় মন ভ’রে যেত।
অতঃপর মহাবিদ্যালয়ে....
বেশ কৃতিত্বের সহিত মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হই। প্রস্তুতি চলে উচ্চ-মাধ্যমিকে ভর্তির তোড়জোড়। গ্রাম ছেড়ে এবার শহরে এসে ভর্তি হই একটি সরকারি
কলেজে। নতুন পরিবেশে খাপ খেয়ে
নিতে একটু কষ্ট হয়। বাড়ির সবার কথা মনে পড়ত। হঠাৎ করে এই রকম অবাধ জীবন পেয়ে কেমন ঘাবড়ে
গিয়েছিলাম, যাইহোক সবকিছু মানিয়ে নিতে চেষ্টা করি। পড়ালেখায় মনোনিবেশের চেষ্টা করি। তবে বিভিন্ন মানসিক ও আর্থিক ঝামেলার মধ্য দিয়ে পার
করতে হয়ছিল জীবনের এই বিশেষ পর্বটা। অনেক
বন্ধু হয়েছিল, দুই একজন বেশ ভালো বন্ধু হিসেবে সুখে-দুখে পাশে
ছিল অনেকদিন, কিন্তু এখন আরো কারো সাথে যোগাযোগ নেই। জীবনের তাগিদে কে কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ আর খবর রাখি না। উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে
আমি একটি সরকারি কলেজে বি এ ভর্তি হয়েছিলাম কিছু দিনের জন্য। এখানে আমি পেয়েছিলাম আমার জীবনের সেরা শিক্ষকদের
একজনকে। তিনি সে-বছর বিসিএস
পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়ে সরকারি কলেজে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। আপাদমস্তক একজন ‘শিক্ষক’ ছিলেন - মননে, বলনে, চলনে। কৃতবিদ্য এ-শিক্ষাগুরু
আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। খুব
বেশি শিক্ষক-কে এত ভালোবেসে এত মমতা মিশিয়ে পড়াতে দেখি নি। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ করে নিতে
পেরেছিলাম তার জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান আমার শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষকের। ইংরেজির প্রতি গ্রামের ছাত্রদের দুর্বলতা থাকা ছিল খুবই স্বাভাবিক একটা
ব্যাপার। আমার সেই ভীতি দূর করিয়ে
আমার মধ্যে অন্যরকম ইংরেজি প্রীতি ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাই ভাষা শিক্ষার যে আনন্দ আমি পেয়েছিলাম তা আজো
যায় নি। বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি ছাড়াও আমি চীনা, স্প্যানিশ ও সোহায়িলি ভাষাও শিখেছিলাম। স্যারের সাথে আমার আজো যোগাযোগ আছে। অকৃতদার স্যার কোনো এক সরকারী কলেজে বর্তমানে
সহযোগী অধ্যাপক। শিক্ষার্থী অন্তপ্রাণ
সেই স্যারের সব জায়গায় বিপুল জনপ্রিয়তা। একজন
শিক্ষক যে কীরকম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে কারো জীবন-কে প্রভাবিত করতে পারে
তার অনন্য উদাহরণ আমার এই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক।
‘বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে ...’
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে ...’
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমার আজকের ‘আমি’কে তৈরি ক’রে
দিয়েছে। আমার জীবনের সেরা সময় এই
বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব। অনার্স-মাস্টার্সের এই পাঁচটি
বছর (যদিও সেশনজট নামক অভিশাপের জন্য প্রায় আট বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে হয়েছে)
আমি নিজেকে নতুন করে চিনেছি, নিজেকে ভিন্নভাবে জেনেছি। শেখার আগ্রহ আমার আগে থেকেই ছিল, তবে এখানে এসে তা ভিন্ন মাত্রায় রূপ নেয়। বেশ মেধাবী এবং চমৎকার কিছু বন্ধু পেয়েছিলাম। বাংলা আমার অনার্সের বিষয় হলেও অনুষঙ্গী বিষয়
হিসেবে পড়েছিলাম সমাজতত্ব, নৃ-বিজ্ঞান, দর্শন, তত্ত্বীয় চারুকলা, ইতিহাস, রাজনীতি বিজ্ঞান ইত্যাদি। লোকসাহিত্য পাঠ আমাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। পাঠ করেছিলাম ভাষাবিজ্ঞানও – যেটি পরবর্তীতে আমার অন্যতম প্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়। শুধু নোট কেন্দ্রিক পড়াশুনা না করে প্রচুর টেক্সট
বই এবং রেফারেন্সধর্মী বই পড়তাম। আগে
গল্প-উপন্যাসের বই পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন
ধরনের প্রবন্ধ ও সমালোচনার বই প’ড়ে আমার চিন্তার জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সবকিছুকে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেবার যে অভ্যাস
ছিল, তা আর রইলো না। বরং সবকিছুকে প্রশ্ন করার, সবকিছুকে সন্দেহ করার প্রবণতা তৈরি হলো। থিসিস, এন্টিথিসিস আর সিন্থেসিস
এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বিষয়কে বিচার করতাম। নিজস্ব
একটা ভাবনা-চিন্তার পরিসর তৈরি হলো। বন্ধুদের সাথে প্রচুর আড্ডা দিতাম। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র ইত্যাদি বিষয়ে তুমুল আলোচনা হতো। বন্ধুরা ছিল বিভিন্ন বিভাগের, যার কারণে বিভিন্ন বিষয় জানার সুযোগ হতো, বিচিত্র ধরনের জ্ঞানের একটা সংশ্লেষ ঘটতো আমাদের আড্ডায়। লেখালেখির হাতেখড়ি হয়েছিল তখন। সবাই মিলে ‘পরস্পর’ নামে একটা ম্যাগাজিন বের করেছিলাম। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, অনুবাদ, বিভিন্ন ধরনের লেখার
সমন্বয়ে সংকলনটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। সাহিত্য
পাঠের আনন্দ, জ্ঞানের প্রতি এক অনির্বচনীয় ভালোলাগা ও মোহ তৈরি
হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকৃতপক্ষে আমাকে একটা নবজন্ম দিয়েছিল। তবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক শিক্ষক আমাদের এই পরিবর্তনে সবিশেষ অবদান রেখেছেন। আবার এটাও সত্য অনেক শিক্ষক আমাদের মনে খুব একটা
দাগ কাটতে পারেন নি। অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ার
সময় আমরা কয়েকজন দুই ফর্মার একটা রম্য ঘরানার পত্রিকা বের করেছিলাম, সেখানে শিক্ষকদের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা সম্পর্কে কিছু সমালোচনা
করেছিলাম। এটার জের আমাদের টানতে
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। যাইহোক, বিশ্ববিদ্যালয় যে জ্ঞান চর্চা ও সৃষ্টির যে একটা মুক্ত মঞ্চ সেটা
আমরা উপলব্ধি করেছিলাম শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও।
‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর....’
একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি আমি আরো কিছু বিষয়ে নিজেকে ব্যপৃত
রেখেছিলাম। তার মধ্যে একটি হলো ভাষা
শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স
দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন আলিয়ঁস ফ্রসেজে ফরাসি ভাষা শিক্ষা শুরু করেছিলাম। সেখানে বেশ কয়েকজন গুণী শিক্ষককে পেয়েছিলাম। যাদের দুইজন ছিলেন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন ছিলেন ফরাসি নাগরিক। তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যে কিছুটা নতুনত্ব
পেয়েছিলাম। তাদের উৎসাহ ও প্রেরণায়
আমি এই কোর্সটি শেষ পর্যন্ত চালিয়ে নিতে সক্ষম হই। এম এ পরীক্ষা শেষ করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি
ফরাসি ডিপ্লোমা (DELF B2) পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করি এবং কৃতকার্য হই। এই ভাষা শিখার সিদ্ধান্তটা ছিল আমার জীবনের একটা
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এই ভাষা জ্ঞান দিয়ে আমি
আফ্রিকায় জাতিসংঘ মিশনে তিন বছরের মত অনুবাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাই। এছাড়াও আফ্রিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ
ভ্রমণেরও যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার সাথেও এই
ভাষা-শিক্ষার যোগসূত্র বিদ্যমান।
‘জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা.....’
ফরাসি ভাষার শেখার পর আমি কিছুদিন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের
কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট-এ চীনা ভাষা শেখার ক্লাসে ভর্তি হই। ভাষা শেখার সাথে সাথে একটি দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ হয়। চীনা ভাষার ক্লাস আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছিল। এখানে এক বছরের মত অধ্যয়নের পর চীন সরকারের
বৃত্তি নিয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের কুন্মিং এ অবস্থিত ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা
ভাষার শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। আমার জীবনের কিছু ব্যতিক্রমি অর্জনের মধ্যে এটি
অন্যতম। সেখানে আমি পেয়েছিলাম
চমৎকার কিছু শিক্ষক যারা আমার শিক্ষণ-শিখনের পরিধিকে আরো বিস্তৃত করেছেন।
‘কত অজানারে জানাইলা তুমি....’
আফ্রিকা মহাদেশের যুদ্ধবিধস্ত দেশ কঙ্গো-তে অবস্থানকালীন সময়ে
সেখানকার স্থানীয় ভাষা সোয়াহিলি ভাষা অধ্যয়ন করি বেশ কিছুদিন। যিনি শিখাতেন তিনি ছিলেন সে দেশের একজন
কলেজ শিক্ষক। তার পড়ানোর ধরনটি এখনও
মনে পড়ে। যদিও জানতাম এই ভাষা
পরবর্তী জীবনে কাজে লাগানো সুযোগ হবে না, তথাপি শুধু জানার ও
শেখার আগ্রহ থেকে এই নতুন ভাষা শিখেছিলাম। ভাষা
সম্পর্কে আমার পূর্ব ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছিল সোয়াহিলি ভাষা জ্ঞান। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এ-ভাষা আমার ভাষা
শিক্ষার জগতকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে।
‘আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ...’
ভাষা শেখার নেশা আমার কখনো যায়নি। আফ্রিকা থেকে দেশে আসার পর যখন কিছুদিন কাজহীন
ছিলাম, সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য শুরু করলাম স্প্যানিশ
ভাষা শিক্ষা। এখানেও পেয়েছিলাম কিছু
হিস্পানিক ভাষা শিক্ষক। শিখা ব্যাপারটা যে কত
প্রাণবন্ত হতে পারে তা এদেরকে দেখে শিখেছিলাম। পেশাগত জীবনে যাই করি না কেন কিন্তু শেখার যে অদম্য আগ্রহ, ছাত্র হয়ে থাকার যে
অভিনব সুখ তা আমি পেয়ে গিয়েছি। নিরন্তর
শিখে যাওয়ার মধ্যে আমি খুঁজে পেতে চাই আমার এই নিরাভরণ সুখ। আমরা প্রতিনিয়ত শিখি। এই পুরো বিশ্বজগৎ আদতে জ্ঞানের এক বিশাল পাঠশালা। আমরা মানুষরা আসলেই সৌভাগ্যবান কারণ জ্ঞানের মত
একটা অন্যরকম ব্যাপার প্রতিটা প্রজন্ম ধারাবাহিকভাবে তার পরের প্রজন্মের জন্য
সংরক্ষণ করে যাচ্ছে এবং তা প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে। আমরা সবাই সে-বিশাল জ্ঞানকাণ্ডের
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শিকর-বাকর।
**** ****
**** ****
বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আমার কিছু ভাবনা ও
সুপারিশ
এখানে খুব প্রাতিষ্ঠানিক ধারনায় আদিষ্ট হয়ে কিছু বলার পক্ষে না। কেননা এইসব বিষয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি
ইতোমধ্যে ভেবেছেন, বলেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে
সেইসবের মূল্য অপরিসীম। আমি সেইসব পড়ে খুব সহজেই
প্রভাবিত হবো এবং চেতনে-অবচেতনে তাদের মনোভাবকেই প্রকাশ করতে বাধ্য হবো। তার চেয়ে একাডেমিক পদ্ধতিতে চিন্তা না ক’রে একজন
সাধারণ নাগরিক কিংবা একজন নবিশ শিক্ষার্থীর চিন্তার আলোকে কিছু প্রকাশ করাটা
সমীচীন হবে মনে করি। যদিও এসব ভাবনাও কোনো না
কোনো ভাবে আমার পূর্ব ও বর্তমানের জ্ঞানের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তথাপি কোনো ধরনের রেফারেন্স ব্যতিরেকে আমার কিছু
ধারনা এখানে প্রকাশ করা যেতে পারে।
প্রথমত শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই বিষয়ে খুব বেশি
গুরুত্ব দেয়া হয় বলে মনে হয় না। পড়া-লেখাটা
এই দেশে অনেকের কাছে শাস্তির মতন। শ্রেণীকক্ষ
আমার কাছে খুব বেশি আনন্দদায়ক কখনোই মনে হয় নি। বরং তার সাথের আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলোর কারণে
পড়া-লেখাটা বিরক্তিকর ঠেকে নি। সহপাঠীদের
সাথে সময়কাটানো, খেলা-ধুলা, সহ-শিক্ষা কার্যক্রম
এগুলো অনেক আনন্দদায়ক ছিল। প্রাথমিক
ও মাধ্যমিকে দেখেছি ১০০ জনে আনুমানিক ২০/২৫ জনে পড়ালেখাটা উপভোগ করে। বাকিরা একটা সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে শিক্ষা-জীবন
পার করে। পড়তে হবে ব’লে পড়ে। পরিবারের চাপে পড়ে। পড়ার জন্য অপার ভালোবাসা তারা অনুভব করে না। এখানে যে পরিসংখ্যানটা দিয়েছে সেটা আমার সম্পূর্ণ
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। অন্যদের
অভিজ্ঞতায় সেটা ভিন্ন হওয়ার সমূহ সম্ভবনা আছে।
দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী
শিক্ষা-জীবন শেষ করতে পারে না। আমি
আমার জীবনে এ-ধরনের অনেক শিক্ষার্থী দেখেছি। আর্থিক
টানা-পোড়ন না থাকলে এরা জীবনে অনেক বড়মাপের মানুষ হতে পারত। কিন্তু শিক্ষার অভাবে ওরা আজ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। যদিও এই রকম সমস্যার মধ্য থেকেও অনেকে ওঠে আসে। কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম। আমরা যারা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তাদেরকে স্মরণ করি, অন্যরা লোকচক্ষুর আড়ালে
চলে যায় চিরদিনের জন্য। আর এত অল্পবয়সে এত
সংগ্রাম একটা শিক্ষার্থীর উপর চাপিয়ে দেয়া ভয়ানক অমানবিক। বাংলাদেশে ধনী-গরীব বৈষম্য যতদিন কমবে না ততদিন
মেধার এই অপরিসীম অপচয় চলতে থাকবে। বিনামূল্যের
শিক্ষা ব্যবস্থা এই সমস্যা-কে কিছুটা লাঘব করতে পারে, তবে খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে না ব’লে আমার ধারনা। একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত গরীব
শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয় উচিত। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন শিক্ষার্থী যদি দারিদ্র্যের কারণে
শিক্ষা-থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেটা এ-সভ্য
সমাজের জন্য কলঙ্কজনক। এটা তাকে হত্যারই
নামান্তর।
তৃতীয়ত মেধাবী শিক্ষকের বড়
প্রয়োজন আমাদের শিক্ষার সবকয়টি স্তরে। প্রাইমারী
থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সবক্ষেত্রে মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প নেই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি আমি
আমার শিক্ষা জীবনের প্রত্যেকটি স্তরে সর্বোচ্চ মাত্র পনের পার্সেন্টের মত শিক্ষক
পেয়েছি, যাদের-কে প্রকৃতপক্ষে ‘শিক্ষক’ বলা যায়। বাকিরা শিক্ষক না হয়ে অন্য কোনো পেশায় গেলে দেশ ও
জাতি উপকৃত হত। আমি মনে করি শিক্ষা-খাতে এটা একটা
ভয়ানক অপচয়। এবং এই অদ্ভূত অনুশীলন
এখনো চলছে। অনেক শিক্ষক আছেন অসম্ভব
বিরক্তি ও ঘৃণা নিয়ে শিক্ষকতা করেন। অন্যকিছু
করতে পারলে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু
তা পারছেন না ব’লে শিক্ষকতা আটকে আছেন। এটা
আসলেই উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষকতায় তারাই আসুক
যারা মনে-প্রাণে এই পেশাকে ভালোবাসে। বাংলাদেশে
শ্রম-বাজারে যে অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা তাতে এ-সমস্যার সমাধান খুবই কঠিন হবে। এছাড়া আমাদের দেশে মানব সম্পদের সুষম বণ্টন না
করা হলে এ-সমস্যার সমাধান মিলবে না।
চতুর্থত, প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক। সরকারি
বিদ্যালয়গুলোতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও বে-সরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে
প্রশিক্ষিত শিক্ষকের খুবই অভাব। আরো
যেটা উদ্বেগের বিষয়, সেটা হচ্ছে শিক্ষক হওয়ার
জন্য যে প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি সেটা অনেকে বুঝতেও পারেন না। এই মনোভাবের কারণে এবং এ-বিষয়ে কোনো কড়াকড়ি না
থাকার কারণে পেশাগত কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই লক্ষ লক্ষ শিক্ষক তাদের দীর্ঘ সময়ের
পেশাগত জীবন অবলীলায় এভাবেই কাটিয়ে দেন। তারা
বুঝতেও পারেন না তাদের কাছে শিক্ষার্থীরা কী পরিমাণ বঞ্চিত হয়েছেন। এই ধরনের ক্ষতির কোনো পরিসংখ্যান আমাদের দেশে নেই, কিংবা এই বিষয়ে কোনো গবেষণাও হলেও সেটা আমার অজানা। সরকারি-বেসরকারি সকল স্তরে পেশাগত প্রশিক্ষণ
প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক করা উচিত। এ-রূপ ব্যবস্থা নিলে, যারা আসলেই শিক্ষক হতে চায়, তাদের চাহিদা বাড়বে এবং
প্রকৃতই শিক্ষক হতে চাওয়া ব্যক্তিরা আরো পেশাদারিত্বের দিকে ধাবিত হবে। এতে বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন
ঘটবে।
পঞ্চমত, আমাদের দেশে
শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কটা খুব একটান স্বাস্থ্যকর নয়। কিছু ব্যতিক্রমবাদে অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের
মনে এমন কোনো সাহস ও স্বস্তি দিতে পারেন না যে সে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা স্বাভাবিক
সম্পর্কের পরিবর্তে একধরনের ভীতিজনক সম্পর্ক তৈরি করে রাখে। অনেক শিক্ষক খুব সচেতনভাবে এই দেয়াল তৈরি করেন। এই দেয়াল শিখন-শিক্ষণে একধরনের অন্তরায়। শিক্ষার্থী অবশ্যই অবলীলায় প্রশ্ন করবেন। শিক্ষকের কাছ থেকে শিখবেন কোনো জড়তা ছাড়া। শিক্ষার্থী অবশ্যই শিক্ষককে শ্রদ্ধা করবেন, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা আদায় যেন জোরপূর্বক না হয়। যদিও জোর করে আর যাই হোক শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না। শিক্ষকদের হতে হবে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা, শিক্ষার্থীদের রোল মডেল বা আইকন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় শিক্ষকেরা এটা মাথায় রাখেন
না। এটা অতিরিক্ত কোনো ব্যাপার নয়, এটা বরং তাদের পেশাদারিত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পরিগণিত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার্থীরা যে-শিক্ষককে মন
থেকে ভালোবাসেন না, তার কাছ কিছু শিখতেও চান
না। প্রাথমিক স্তরে এটা অনেকাংশে সত্য বলে আমার মনে
হয়। কাজেই প্রত্যেক শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীদের
মানসিক অবস্থার রসায়নকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করা এবং সে অনুসারে অপরিপক্ক মনকে
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। এর
জন্য কোনো প্রশিক্ষণ জরুরি নয়, বরং একজন শিক্ষকের
সদিচ্ছাই যথেষ্ট।
ষষ্টত, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের
শিক্ষাব্যবস্থার একটা যৌক্তিক সমন্বয় করা জরুরি। প্রাথমিক স্তর থেকে যে বিভাজন শুরু হয়, তা একটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে আমার ধারনা। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তথা দেশ চালক। বিচিত্র পদ্ধতির পড়াশুনার কারণে বিচিত্র
মানসিকতার নাগরিক তৈরি হচ্ছে, এবং এদের চিন্তা-ভাবনার
মধ্যেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন ফারাক। আমার
সাথে প্রাইমারীতে পড়া শুরু করেছিল যে বন্ধু, সে হয়তো মাদ্রাসায় চ’লে
যায়, কিংবা ইংলিশ মিডিয়ামে। আজ তার জীবনবোধ আর জীবনভাবনা মুদ্রার এপিট-ওপিট। বৈচিত্র্যের প্রতি আমার কোনো বিরাগ নেই, আর মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম এসব-কে
বৈচিত্র্যেরর চেয়ে আমি ‘বিভাজন’ নামে আখ্যায়িত করার
চেষ্টা করি। এই বিভাজন যে খুবই
সুস্পষ্ট তা আমরা জেনেও না জানার ভান ক’রে থাকি অনেকসময় । আর এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত শিক্ষার্থীর
আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। কাজেই ব্যপারটা
বৈচিত্র্যর নয়, বরং অবিচারের। কমপক্ষে মাধ্যমিক পর্যন্ত মোটামুটি একটা অভিন্ন
ধারার আধুনিক ও যুগোপযোগী রাষ্ট্রীয় শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রচলন থাকা উচিত। ‘মোটামুটি’ বলছি যাতে বিদ্যমান ধারাকে যদি রাতারাতি পরিবর্তন করতে সমস্যা হয়
তাহলে মৌলিক ও প্রধান কিছু বিষয় সবার জন্য যেন বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তীতে প্রত্যেকে নিজের পছন্দ অনুসারে তার
ভবিষ্যত পাঠ বেছে নিতে পারে।
যাই হোক উপসংহারে আমি বলতে চাই, যে কোনো জাতির জন্য
শিক্ষা খুবই গুরত্বপূর্ণ। একটা জাতির ভবিষ্যৎ
নির্ধারিত হয় শিক্ষাদীক্ষায় সে-জাতি কত অগ্রসর তার উপর ভিত্তি করে। আর যুগপোযোগী শিক্ষা ছাড়া যথার্থ মানবসম্পদ তৈরি
অসম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান
শিক্ষাব্যবস্থা সেই পথে এগোচ্ছে - এ-কথা জোর গলায় বলা যাবে না। আজ থেকে পনের বিশ বছর আগের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক
শিক্ষার সাথে বর্তমান সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অনেক ধরনের বাহ্যিক পরিবর্তন লক্ষণীয়। কিন্তু গুনগত মানে আজকের শিক্ষা-ব্যবস্থা অনেক
প্রাগ্রসর – সে-কথা আত্মবিশ্বাসের সাথে খুব বেশি লোক বলবেন
বলে মনে হয় না। কাজেই আমাদের
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে এবং কীভাবে বিশ্বমানের শিক্ষা-ব্যবস্থা তৈরি
করা যায় সেটা নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি নিরলস কাজ করে যেতে হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন