প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পরাবাস্তবতাবাদ ঘরানার শিল্প-আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। সমাজের অবক্ষয়, যুদ্ধ, হানাহানি, সন্ত্রাসের দমবন্ধ করা পরিবেশ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে আর স্বাভাবিক থাকতে দিচ্ছিল না। সেইসময় সৃষ্টিশীল ও সংবেদনশীল মানুষের ক্ষোভ ও যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ শিল্প-কলার মাধ্যমে বিচিত্রভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এটার সূচনাকালকে মোটাদাগে চিহ্নিত করতে হলে মূলত বিশ শতকের শুরুর দিকে নজর ফেলতে হবে। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, দর্শন, রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনা সবকিছুতেই এই শিল্পান্দোলনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
অনেকে মনে করেন পরাবাস্তবতাবাদ আসে ডাডাইজম বা দাদাবাদের হাত ধরে। দাদাবাদের পরিমার্জিত ও জনপ্রিয় রূপ হলো পরাবাস্তবতাবাদ। দাদাবাদের সূচনা হয় মূলত ইউরোপে। যদিও দাদাবাদ-কে স্বতন্ত্র শিল্পান্দোলন বলেন অনেক শিল্প-সমালোচক ও এই আন্দোলনের কর্মীরা। পরাবাস্তবতাবাদ এর মূল কথা হলো প্রথাগত যুক্তির শৃঙ্খলকে অস্বীকার করে অবচেতন মনের ভাবনাকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা। অবচেতন মনের ভাবনাকে আমদের যৌক্তিক চিন্তা বা বুদ্ধি দিয়ে হয়তো ব্যাখ্যা করা কঠিন।তাই শিল্পী-সাহিত্যিকরা তাদের অনুভূতিগুলো প্রকাশে কোনো বিধি-নিষেধ মানতে চান নি। নিজের মত করে লিখে গেছেন সময়ের ধারাভাষ্য। তারা চেয়েছিলেন সময়কে তাদের মধ্যে ধারন করতে। তারা ছিলেন কাল ও সময়ের বার্তা-বাহক। তাদের অনুভূতিপ্রবণ মনে ক্ষোভ ও বেদনা ছিল। এই ক্ষোভ প্রচলিত বিশ্বাস ও প্রথার বিরুদ্ধে। কেননা প্রচলিত মূল্যবোধ বা ধ্যান-ধারণা তখন ব্যর্থ হচ্ছিল পৃথিবীকে যুদ্ধ, অবিচার, অনিয়মের হাত থেকে রক্ষা করতে। তারা খুব অসহায় বোধ করেন; কিছু করতে না পারার যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে তাদের অন্তরাত্মা। কাল বা সময়কে খুব দ্রুত উপলব্ধি শিল্পী-সাহিত্যিকেরা। দ্রোহের বাণী নিয়ে হাজির হন তারা। হাজারো বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে শিল্পী আকেঁন তার প্রতিবাদের চিত্রমালা, ভাস্করের ছেনির আঘাতে কথা বলে উঠে প্রস্তরখণ্ড। কেউ বা বাদ্যযন্ত্র হাতে তার প্রতিবাদের শ্লোগানকে পৌঁছে দেন আপামর মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে। বিংশ শতকের শুরুতে পৃথিবী পার করে এক বেদনাদগ্ধ ক্রান্তিকাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সবুজ গ্রহ। শিল্পীদের তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় আর যুগসচেতন মন বুঝে নিয়েছিল সামনে আসছে ভয়ঙ্কর দিন। তারা দেখেন এখানে মানুষ নিজেকে দাবি করে সভ্য ও মানবিক বলে, অথচ এই পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নিহত হচ্ছে অন্যায্য ও বিভীষিকাময় যুদ্ধের কবলে পড়ে। সেগুলোকে জায়েজ করার জন্যও ছলের অভাব নেই। মানুষের ভিতর একধরনের টানাপোড়ন চলছিল। ক্ষমতা আর লোভ হয়ে উঠছিল অন্যতম চালিকাশক্তি। মানুষের ভেতরকার ভণ্ডামিও আর ঢেকে রাখা যাচ্ছিল না। সাধারণ মানুষ হয়ে যাচ্ছিল ক্ষমতাবানদের হাতের ক্রীড়ানক। সামাজিক এই পরিবর্তন ব্যক্তির মননেও পরিবর্তন আনয়ন করে। সেই সাথে প্রকাশের মাধ্যমে আসে পরিবর্তন।
সালভাদর দালি-র একটি ভাস্কর্য
শিল্পী-সাহিত্যিকদের সেই নবধর্মী প্রকাশই মূলত আধুনিকতার উন্মেষকালকে সূচিত করে। শিল্প-জগতে তখন এমনিতেই পরিবর্তনের যে হাওয়া তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। রেঁনেসাঁসের ধ্রুপদী বা ক্ল্যাসিক শিল্পের বদলে শিল্পীরা খুঁজছিলেন নতুন কিছু। মানুষের মনোজগত, অর্থনৈতিক দুনিয়া, রাজনৈতিক বীক্ষা সবকিছুতেই নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়। উনবিংশ শতকের শেষদিকে শিল্পকলায় বৈচিত্র্য দেখা দেয়। রেনেসাঁসের শিল্পের ভাষা আর এই সময়ের শিল্পের ভাষায় অনেকটা বিপরীত-মুখী হয়ে ওঠে। আধুনিক শিল্প-আন্দোললনের ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকে।
বিংশ শতকের প্রথম দশকে কিউবিজম-এর মত যুগান্তকারী শিল্পধারার জন্ম নেয়। পাবলো পিকাসো, জর্জ ব্রাক প্রমুখ রঙ আর ফর্মে নিয়ে আসেন বিপ্লব। ধীরে ধীরে আরো নতুন ধারার জন্ম হতে থাকে। ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশিনিজম, দাদাইজম, স্যুররিয়ালিজম ইত্যাদি শিল্প-মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা রঙে রেখায় শব্দে এতদিনের প্রথাগত জগতের বাইরে অন্য এক জগতের দিকে ধাবিত হতে থাকে। শিল্পী-সাহিত্যকের মনে জন্ম নেয় নতুনতর সংবেদনশীলতা। এই সংবেদনশীলতা আসলে যুগ ও কালেরও ধারক ও বাহক। প্রত্যেকটা যুগ যেমন নিয়ে আসে নতুনতর ধ্যান-ধারণা আর চিন্তা এও তেমনি। আধুনিকতার শুরু মূলত উনবিংশ শতকের শেষের দশকদ্বয়। এই সময়ে দেখা দেয় মালার্মে (১৮৪২-১৮৯৮) উসম্যঁ, লোত্রেয়ামোঁ প্রমুখ যারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বদলেয়ার (১৮৪৪-১৮৬৬), ফ্লবেয়ার এর মত যুগন্ধরদের দ্বারা। তবে আধুনিকতার সবচেয়ে উর্বর কাল বা পরিপুষ্টি লক্ষ্য করি ১৯১০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। জেমস জয়েসের 'ইউলিসিস', টি এস এলিয়টের 'পোড়োজমি', রিলকের 'অর্ফিয়ুসের প্রতি সনেটগুচ্ছ' বের হয় এই সময়কালের মধ্যে, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। এর দু-বছর পর আন্দ্রে ব্রেঁতো তাঁর 'পরাবাস্তবাদের ইশতেহার' নিয়ে হাজিরে হন। ধীরে ধীরে শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলার চেনারূপ অচেনা হতে থাকে।
স্যুররিয়ালিজম আধুনিকতাবাদী শিল্প-কলাকে ধারণ করে তার অস্থি-মজ্জায়। আধুনিকতাবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো নান্দনিক পরিশীলন। আর একটা শব্দ আধুনিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঃ বিমানবিকীকরণ। এই বিমানবিকীকরণকে অমানবিক মনে করলে সেটা হবে স্থূল একটা ভুল। শিল্প-কলায় প্রথাগত মানবিক উপাদানের যখন ঘাটতি দেখা দেয় তখন সেটিকে শিল্পের বিমানবিকীকরণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মানবিক উপাদান বাস্তবতার দুঃখ ভারাক্রান্ত রূপকে তুলে ধরে, হাসি-কান্না দিয়ে মানুষের আবেগকে সুড়সুড়ি দেয়। শিল্পের সাথে জীবনকে মিলিয়ে দেখেন, মূলত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিকে তারা বিভিন্ন ফর্মে তুলে ধরেন। আধুনিকতাবাদীরা এই ধারা থেকে সরে আসেন। আঙ্গিক, রীতি আর উপস্থাপনার কৌশলে আধুনিক শিল্প-কলা অনেকসময় সাধারণ্যের বোধগম্যের স্তরকে ছাড়িয়ে যায়। এটা শুধু শিল্প-কলাকে দূরূহ করে না, রীতি-নীতেতেও ঘটায় অভাবনীয় ও অন্যরকম বিপর্যয়। এই ধারায় এতদিনকার প্রথাগত ধর্মবিশ্বাসও বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। তৈরি হয় নব নব মূল্যবোধ।কেননা প্রথাগত ধর্ম কালোপোযগীতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি, নবীন মূল্যবোধের জনকেরা এর মধ্যে খূঁজে পান না কোনো মহিমা,বরং তাদের কাছে মনে হয়, বিশ্বাসগুলো তার মধ্যে ধারণ ও লালন করছে চরম অন্ধকার ও অযুক্তি। এগুলো এত অর্থহীন যে নতুন বিশ্বাসের সাথে দাঁড়াতেও পারছে না। ভলতেয়ার এরি মধ্যে বিশ্বাসের এ-দূর্গে বেশ ঝাঁকুনি দিয়েছেন, আর ডারউইন রীতিমত সে বিশ্বাসের প্রাচীর ডিঙিয়ে প্রাসাদের অভ্যন্তরকেও তছনছ করে দিয়েছেন। তারা মনে করেন অবচেতন মনে যে ভাবনাগুলো আসে সেগুলোতে দৈনন্দিন জীবনের ভণ্ডামি থাকে না। শিল্পী নিজের মত করে নিজের জন্য এক জগত তৈরি করেন। নিজস্ব চিন্তা-চেতনা তাঁর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রথম নিজের ভেতরকার ভাবনার ভেতর ডুব দেন, যে ভাঙা-গড়া চলছে সব কিছুকে তুলে ধরেন অবলীলায়। তাঁর ভেতরের ক্লেদ, গ্লানি, অন্ধকার, বিবমীষা, বিচ্ছিন্নতা, অন্ধকার, অসহায়ত্ব, ঘৃণা, বিনষ্টি, যুক্তি-অযুক্তি, স্বপ্ন, বেদনা, কারুণ্য, জিঘাংসা সব কিছু তাদের কাছে শিল্পের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। তারা মনে করেন কোনো কিছুই নয় শিল্পের বাহিরে। বিশ্বাস করেন 'শিল্পের জন্য শিল্প' এই বাণীতে। এই কারণে আমরা দেখি পরাবস্তবাদী শিল্প-কর্মে থাকে যুক্তিহীনতা, থাকে আকস্মিকতা, শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা। উদ্ভট এবং অভূতপূর্ব অনুষঙ্গকে এই শিল্পীরা সাদরে তাদের শিল্প-কলার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেন। শুরু করেন বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা। এরিমধ্যে ফ্রয়েডের মনোজাগতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন এক বিপ্লব ঘটায়। মনের ভেতরের রহস্য আর স্বপ্নের নতুনতর ব্যাখ্যা আধুনিকদের বেশ প্রভাবিত করে। পুরাণ, প্রতীক আর চেতন-অচেতন-অবচেতন মনের মিথস্ক্রিয়া শিল্প-কলায় জায়গা নিতে থাকে। ফরাসি কবি আন্দ্রে ব্রেতোঁ ( ১৮৯৬-১৯৬৬) ১৯২৪ সালে প্রথম পরাবাস্তবতাবাদের ইশতেহার ঘোষণা করেন। তাঁর ‘দ্য মেনিফেস্টো অব স্যুররিয়ালিজম’ এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়। ব্রেতোঁ মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিষয়ে পারঙ্গম ছিলেন, জানতেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অবচেতন মনের তত্ত্ব। তখন চারিদিকে ফ্রয়েডের 'নির্জ্ঞান মনের তত্ত্ব'-র জয়জয়কার। তাঁর আগে মনকে ফুলের পাপড়ির মত এত সুন্দর করে খুলে দেখান নি কেউ। মনের সাথে জড়িয়ে যেত সজ্ঞাবাদ আর বিভিন্ন ধরনের রহস্যময় চিন্তা। কিন্তু ফ্রয়েড চেষ্টা করেন মন ও মানসিক কার্যপরিধিকে নির্মোহভাবে যুক্তি ও বিজ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করতে। আনুষঙ্গিক প্রভাবকগুলোকে জড়ো করেন আমাদের চেতন-অবচেতন মনের কার্য-কলাপকে ব্যাখ্যা করতে। তুলে ধরেন কীভাবে সামাজিক বিভিন্ন ট্যাবু বা বাধা-নিষেধ আমাদের স্বাভাবিক ভাবনা-চিন্তা ও তার প্রকাশকে প্রভাবিত করে। সেই বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ও অব্যাখ্যেয় বিষয়বস্তু শিল্প-কলায় রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে নান্দনিক ও অন্যরকম আঙ্গিক নিয়ে। তারা এটাকে কল্পনার শুদ্ধতা দিয়ে, তৈরি করেন কলাকৈবিল্যবাদী শিল্প। এই শিল্প শুধু শিল্পকেই ধারণ করে। এর মধ্যে অন্যকিছু খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক। কারণ শিল্পী এখানে সমাজ বাস্তবতার উর্ধে উঠে বিনির্মাণ করেন তার আপন সুষমা-মণ্ডিত শিল্পদুনিয়া। এরা মূলত সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন ক্লেদ-গ্লানিযুক্ত যুদ্ধগ্রস্থ পৃথিবীর হতাশার দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে। কারণ তাদের সংবেদনশীল মন সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণাদগ্ধ হচ্ছিল মারী, রক্তপাত আর অযুত বিনাশী কর্মকাণ্ডে। ***************
সালভাদর দালি
সালভাদর দালি-র মোমের মূর্তি।
অনেকে মনে করেন পরাবাস্তবতাবাদ আসে ডাডাইজম বা দাদাবাদের হাত ধরে। দাদাবাদের পরিমার্জিত ও জনপ্রিয় রূপ হলো পরাবাস্তবতাবাদ। দাদাবাদের সূচনা হয় মূলত ইউরোপে। যদিও দাদাবাদ-কে স্বতন্ত্র শিল্পান্দোলন বলেন অনেক শিল্প-সমালোচক ও এই আন্দোলনের কর্মীরা। পরাবাস্তবতাবাদ এর মূল কথা হলো প্রথাগত যুক্তির শৃঙ্খলকে অস্বীকার করে অবচেতন মনের ভাবনাকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা। অবচেতন মনের ভাবনাকে আমদের যৌক্তিক চিন্তা বা বুদ্ধি দিয়ে হয়তো ব্যাখ্যা করা কঠিন।তাই শিল্পী-সাহিত্যিকরা তাদের অনুভূতিগুলো প্রকাশে কোনো বিধি-নিষেধ মানতে চান নি। নিজের মত করে লিখে গেছেন সময়ের ধারাভাষ্য। তারা চেয়েছিলেন সময়কে তাদের মধ্যে ধারন করতে। তারা ছিলেন কাল ও সময়ের বার্তা-বাহক। তাদের অনুভূতিপ্রবণ মনে ক্ষোভ ও বেদনা ছিল। এই ক্ষোভ প্রচলিত বিশ্বাস ও প্রথার বিরুদ্ধে। কেননা প্রচলিত মূল্যবোধ বা ধ্যান-ধারণা তখন ব্যর্থ হচ্ছিল পৃথিবীকে যুদ্ধ, অবিচার, অনিয়মের হাত থেকে রক্ষা করতে। তারা খুব অসহায় বোধ করেন; কিছু করতে না পারার যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে তাদের অন্তরাত্মা। কাল বা সময়কে খুব দ্রুত উপলব্ধি শিল্পী-সাহিত্যিকেরা। দ্রোহের বাণী নিয়ে হাজির হন তারা। হাজারো বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে শিল্পী আকেঁন তার প্রতিবাদের চিত্রমালা, ভাস্করের ছেনির আঘাতে কথা বলে উঠে প্রস্তরখণ্ড। কেউ বা বাদ্যযন্ত্র হাতে তার প্রতিবাদের শ্লোগানকে পৌঁছে দেন আপামর মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে। বিংশ শতকের শুরুতে পৃথিবী পার করে এক বেদনাদগ্ধ ক্রান্তিকাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সবুজ গ্রহ। শিল্পীদের তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় আর যুগসচেতন মন বুঝে নিয়েছিল সামনে আসছে ভয়ঙ্কর দিন। তারা দেখেন এখানে মানুষ নিজেকে দাবি করে সভ্য ও মানবিক বলে, অথচ এই পৃথিবীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নিহত হচ্ছে অন্যায্য ও বিভীষিকাময় যুদ্ধের কবলে পড়ে। সেগুলোকে জায়েজ করার জন্যও ছলের অভাব নেই। মানুষের ভিতর একধরনের টানাপোড়ন চলছিল। ক্ষমতা আর লোভ হয়ে উঠছিল অন্যতম চালিকাশক্তি। মানুষের ভেতরকার ভণ্ডামিও আর ঢেকে রাখা যাচ্ছিল না। সাধারণ মানুষ হয়ে যাচ্ছিল ক্ষমতাবানদের হাতের ক্রীড়ানক। সামাজিক এই পরিবর্তন ব্যক্তির মননেও পরিবর্তন আনয়ন করে। সেই সাথে প্রকাশের মাধ্যমে আসে পরিবর্তন।
সালভাদর দালি-র একটি ভাস্কর্য
শিল্পী-সাহিত্যিকদের সেই নবধর্মী প্রকাশই মূলত আধুনিকতার উন্মেষকালকে সূচিত করে। শিল্প-জগতে তখন এমনিতেই পরিবর্তনের যে হাওয়া তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। রেঁনেসাঁসের ধ্রুপদী বা ক্ল্যাসিক শিল্পের বদলে শিল্পীরা খুঁজছিলেন নতুন কিছু। মানুষের মনোজগত, অর্থনৈতিক দুনিয়া, রাজনৈতিক বীক্ষা সবকিছুতেই নতুনত্ব পরিলক্ষিত হয়। উনবিংশ শতকের শেষদিকে শিল্পকলায় বৈচিত্র্য দেখা দেয়। রেনেসাঁসের শিল্পের ভাষা আর এই সময়ের শিল্পের ভাষায় অনেকটা বিপরীত-মুখী হয়ে ওঠে। আধুনিক শিল্প-আন্দোললনের ক্ষেত্র তৈরি হতে থাকে।
বিংশ শতকের প্রথম দশকে কিউবিজম-এর মত যুগান্তকারী শিল্পধারার জন্ম নেয়। পাবলো পিকাসো, জর্জ ব্রাক প্রমুখ রঙ আর ফর্মে নিয়ে আসেন বিপ্লব। ধীরে ধীরে আরো নতুন ধারার জন্ম হতে থাকে। ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশিনিজম, দাদাইজম, স্যুররিয়ালিজম ইত্যাদি শিল্প-মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা রঙে রেখায় শব্দে এতদিনের প্রথাগত জগতের বাইরে অন্য এক জগতের দিকে ধাবিত হতে থাকে। শিল্পী-সাহিত্যকের মনে জন্ম নেয় নতুনতর সংবেদনশীলতা। এই সংবেদনশীলতা আসলে যুগ ও কালেরও ধারক ও বাহক। প্রত্যেকটা যুগ যেমন নিয়ে আসে নতুনতর ধ্যান-ধারণা আর চিন্তা এও তেমনি। আধুনিকতার শুরু মূলত উনবিংশ শতকের শেষের দশকদ্বয়। এই সময়ে দেখা দেয় মালার্মে (১৮৪২-১৮৯৮) উসম্যঁ, লোত্রেয়ামোঁ প্রমুখ যারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বদলেয়ার (১৮৪৪-১৮৬৬), ফ্লবেয়ার এর মত যুগন্ধরদের দ্বারা। তবে আধুনিকতার সবচেয়ে উর্বর কাল বা পরিপুষ্টি লক্ষ্য করি ১৯১০ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। জেমস জয়েসের 'ইউলিসিস', টি এস এলিয়টের 'পোড়োজমি', রিলকের 'অর্ফিয়ুসের প্রতি সনেটগুচ্ছ' বের হয় এই সময়কালের মধ্যে, ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। এর দু-বছর পর আন্দ্রে ব্রেঁতো তাঁর 'পরাবাস্তবাদের ইশতেহার' নিয়ে হাজিরে হন। ধীরে ধীরে শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকলার চেনারূপ অচেনা হতে থাকে।
স্যুররিয়ালিজম আধুনিকতাবাদী শিল্প-কলাকে ধারণ করে তার অস্থি-মজ্জায়। আধুনিকতাবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো নান্দনিক পরিশীলন। আর একটা শব্দ আধুনিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঃ বিমানবিকীকরণ। এই বিমানবিকীকরণকে অমানবিক মনে করলে সেটা হবে স্থূল একটা ভুল। শিল্প-কলায় প্রথাগত মানবিক উপাদানের যখন ঘাটতি দেখা দেয় তখন সেটিকে শিল্পের বিমানবিকীকরণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মানবিক উপাদান বাস্তবতার দুঃখ ভারাক্রান্ত রূপকে তুলে ধরে, হাসি-কান্না দিয়ে মানুষের আবেগকে সুড়সুড়ি দেয়। শিল্পের সাথে জীবনকে মিলিয়ে দেখেন, মূলত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিকে তারা বিভিন্ন ফর্মে তুলে ধরেন। আধুনিকতাবাদীরা এই ধারা থেকে সরে আসেন। আঙ্গিক, রীতি আর উপস্থাপনার কৌশলে আধুনিক শিল্প-কলা অনেকসময় সাধারণ্যের বোধগম্যের স্তরকে ছাড়িয়ে যায়। এটা শুধু শিল্প-কলাকে দূরূহ করে না, রীতি-নীতেতেও ঘটায় অভাবনীয় ও অন্যরকম বিপর্যয়। এই ধারায় এতদিনকার প্রথাগত ধর্মবিশ্বাসও বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। তৈরি হয় নব নব মূল্যবোধ।কেননা প্রথাগত ধর্ম কালোপোযগীতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি, নবীন মূল্যবোধের জনকেরা এর মধ্যে খূঁজে পান না কোনো মহিমা,বরং তাদের কাছে মনে হয়, বিশ্বাসগুলো তার মধ্যে ধারণ ও লালন করছে চরম অন্ধকার ও অযুক্তি। এগুলো এত অর্থহীন যে নতুন বিশ্বাসের সাথে দাঁড়াতেও পারছে না। ভলতেয়ার এরি মধ্যে বিশ্বাসের এ-দূর্গে বেশ ঝাঁকুনি দিয়েছেন, আর ডারউইন রীতিমত সে বিশ্বাসের প্রাচীর ডিঙিয়ে প্রাসাদের অভ্যন্তরকেও তছনছ করে দিয়েছেন। তারা মনে করেন অবচেতন মনে যে ভাবনাগুলো আসে সেগুলোতে দৈনন্দিন জীবনের ভণ্ডামি থাকে না। শিল্পী নিজের মত করে নিজের জন্য এক জগত তৈরি করেন। নিজস্ব চিন্তা-চেতনা তাঁর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রথম নিজের ভেতরকার ভাবনার ভেতর ডুব দেন, যে ভাঙা-গড়া চলছে সব কিছুকে তুলে ধরেন অবলীলায়। তাঁর ভেতরের ক্লেদ, গ্লানি, অন্ধকার, বিবমীষা, বিচ্ছিন্নতা, অন্ধকার, অসহায়ত্ব, ঘৃণা, বিনষ্টি, যুক্তি-অযুক্তি, স্বপ্ন, বেদনা, কারুণ্য, জিঘাংসা সব কিছু তাদের কাছে শিল্পের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। তারা মনে করেন কোনো কিছুই নয় শিল্পের বাহিরে। বিশ্বাস করেন 'শিল্পের জন্য শিল্প' এই বাণীতে। এই কারণে আমরা দেখি পরাবস্তবাদী শিল্প-কর্মে থাকে যুক্তিহীনতা, থাকে আকস্মিকতা, শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা। উদ্ভট এবং অভূতপূর্ব অনুষঙ্গকে এই শিল্পীরা সাদরে তাদের শিল্প-কলার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেন। শুরু করেন বিভিন্ন ধরনের নিরীক্ষা। এরিমধ্যে ফ্রয়েডের মনোজাগতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন এক বিপ্লব ঘটায়। মনের ভেতরের রহস্য আর স্বপ্নের নতুনতর ব্যাখ্যা আধুনিকদের বেশ প্রভাবিত করে। পুরাণ, প্রতীক আর চেতন-অচেতন-অবচেতন মনের মিথস্ক্রিয়া শিল্প-কলায় জায়গা নিতে থাকে। ফরাসি কবি আন্দ্রে ব্রেতোঁ ( ১৮৯৬-১৯৬৬) ১৯২৪ সালে প্রথম পরাবাস্তবতাবাদের ইশতেহার ঘোষণা করেন। তাঁর ‘দ্য মেনিফেস্টো অব স্যুররিয়ালিজম’ এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়। ব্রেতোঁ মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিষয়ে পারঙ্গম ছিলেন, জানতেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অবচেতন মনের তত্ত্ব। তখন চারিদিকে ফ্রয়েডের 'নির্জ্ঞান মনের তত্ত্ব'-র জয়জয়কার। তাঁর আগে মনকে ফুলের পাপড়ির মত এত সুন্দর করে খুলে দেখান নি কেউ। মনের সাথে জড়িয়ে যেত সজ্ঞাবাদ আর বিভিন্ন ধরনের রহস্যময় চিন্তা। কিন্তু ফ্রয়েড চেষ্টা করেন মন ও মানসিক কার্যপরিধিকে নির্মোহভাবে যুক্তি ও বিজ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করতে। আনুষঙ্গিক প্রভাবকগুলোকে জড়ো করেন আমাদের চেতন-অবচেতন মনের কার্য-কলাপকে ব্যাখ্যা করতে। তুলে ধরেন কীভাবে সামাজিক বিভিন্ন ট্যাবু বা বাধা-নিষেধ আমাদের স্বাভাবিক ভাবনা-চিন্তা ও তার প্রকাশকে প্রভাবিত করে। সেই বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত ও অব্যাখ্যেয় বিষয়বস্তু শিল্প-কলায় রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে নান্দনিক ও অন্যরকম আঙ্গিক নিয়ে। তারা এটাকে কল্পনার শুদ্ধতা দিয়ে, তৈরি করেন কলাকৈবিল্যবাদী শিল্প। এই শিল্প শুধু শিল্পকেই ধারণ করে। এর মধ্যে অন্যকিছু খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক। কারণ শিল্পী এখানে সমাজ বাস্তবতার উর্ধে উঠে বিনির্মাণ করেন তার আপন সুষমা-মণ্ডিত শিল্পদুনিয়া। এরা মূলত সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন ক্লেদ-গ্লানিযুক্ত যুদ্ধগ্রস্থ পৃথিবীর হতাশার দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে। কারণ তাদের সংবেদনশীল মন সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণাদগ্ধ হচ্ছিল মারী, রক্তপাত আর অযুত বিনাশী কর্মকাণ্ডে। ***************
সালভাদর দালি
সালভাদর দালি-র মোমের মূর্তি।
সালভাদর দালি-র একটি ভাস্কর্য |
সালভাদর দালি-র 'পারসিসটেন্স অব মেমোরি' ছবিটি যখন প্রথম দেখি বেশ আলোড়িত হয়েছিলাম। গলতে থাকা পকেট-ঘড়ি, সাগর-পাহাড় আর পাতাহীন বৃক্ষ এক আধিভৌতিক জগতের চিত্রকে তুলে ধরেছিল আমার সামনে। তার চিত্র ও ভাস্কর্যগুলো কি এক অনর্বচনীয় ও অব্যক্ত ভালোলাগায় বুঁদ করে রাখত।
চিত্র-কলা ভালো বুঝি না, বিশেষ করে আধুনিক চিত্রকলা তার উপর এই ধরনের অকল্পনীয় শিল্প-কর্ম দেখলে খুব অসহায় বোধ করি।
টুকরো টুকরো কিছু অর্থ দাঁড় করায়, বোধের গভীরে নিয়ে নাড়াচাড়া করি কিন্তু আধুনিক অনেক কবিতার মত আধুনিক চিত্রকলাও অধরাই থেকে যায়।
স্পেনিশ শিল্পী দালি ১৯০৪ সালে উত্তর কাতালোনিয়ার ফিগুয়েরে জন্মগ্রহণ করেন। নিজেকে জাহির করার একটা অদ্ভূত প্রবণতা ছিল। তাঁর ঐতিহাসিক গোঁফ-এর কথা নাই বা বললাম। ওস্লো নামে তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল একটি বিড়াল। তাঁর জীবন যাপন প্রণালী অনেকের কাছে বেশ অদ্ভূত ও হাস্যরসাত্নক ছিল।
আর মাঝে এমন সব কথা-বার্তা বলতেন, যাতে সহজে লোকজনের মনোযোগ পেয়ে যেতেন। প্রচলিত আছে, রাস্তার কোনো লোককে যদি একজন আধুনিক শিল্পীর নাম বলতে বলা হয়, সে নামটি হবে সালভাদর দালি-র। এত জনপ্রিয় ও সাধারণ্যে পরিচিত হতে পেরেছিলেন তিনি।
সান ফারনান্দো ইনস্টিউট, মাদ্রিদ এ চারুকলা পড়ার জন্য ভর্তি হন, ১৯২২ সালে। অবশ্য চিত্রকলায় হাতে-খড়ি হয় আরো আগে। এখানে এসে ভাস্কর্য আর চিত্রকলায় দক্ষতা বাড়তে থাকে। শিক্ষকদের সাথে তার মতের মিল হত খুবই কম। মাদ্রিদে তাঁর সাথে বন্ধুত্ব হয় গার্সিয়া লোরকা, বুনোয়েল প্রমুখের সাথে। ১৯২৬ সালের প্রথম বারের মত প্যরিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, সেখানে পরিচয় আরেক বিখ্যাত শিল্পী পিকাসো-র সাথে। এছাড়াও ব্রেঁতো, এলুয়ার, মাগ্রিত প্রমুখের সাথে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ১৯২৯ সালে তার এগারটি পেইন্টিং নিয়ে প্যারিসে প্রথম বারের মত চিত্র-প্রদর্শনী করেন। আস্তে আস্তে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।
১৯৪১ সালে নিউইয়র্কে একটি প্রদর্শনী হয়। ১৯৪২ সালে প্রকাশ করেন তাঁর আত্মজীবনী 'সিক্রেট লাইফ'।
তাঁর বিচিত্র ও বর্ণিল জীবনের অবসান হয় ২৩ জানুয়ারি ১৯৮৯।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন