বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

ফেলে আসা বাড়ি - কে হায় হৃদয় খুঁড়ে - ১


জনৈক দাদাকে

প্রিয় দাদা,

প্রণাম ও শুভেচ্ছা জানবেন। ফেইসবুকে আপনার একটি মন্তব্যের আলোকে এই লেখা। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ আছে, এবং আপনার প্রত্যুত্তর আমাকে অনেক উৎসাহ যোগাবে।  

আপনি একসময় বেশ লেখালেখি করতেন।  আমার অনুরোধ আবার শুরু করুন, আমাদের বাড়ি, আমাদের অতীত-ইতিহাস, আমাদের অতীতের এবং বর্তমানের যাপিত জীবন -  এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। আজ সারা পৃথিবীতে আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি, আমাদের কথা আমরা না বললে, আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা এবং আমরা নিজেরাই ইতিহাসের পাতা থেকে একদিন বিলীন হয়ে যাবো। নতুন প্রজন্ম কোনো দিশা খুঁজে পাবে না। সবার সম্মিলিত স্মৃতির মাধ্যমে আমরা আমাদের অতীত ইতিহাসকে ভাবীকালের জন্য রেখে যেতে পারবো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তখন। দিন তারিখ মনে নেই। তবে সময়টা মনে আছে। তখন বিকেলে - গোধুলী বেলা ফুরিয়েছে। আকাশ জুড়ে আবছা আবছা অন্ধকারের মশারি ছায়া হয়ে নেমেছিল চরাচরে। এই সময়টাতে আমি ঘর থেকে বের হয়ে উঠোন আর বাড়ির দরজায় হাঁটতে থাকি। বাড়িতে গেলে বই নিয়ে যেতাম, দুপুরে ভাত খেয়ে বিছানায় এলিয়ে দিতাম গা, হাতের কনুই দিয়ে বালিশের উপর ভর আধশোয়া হয়ে বই পড়াটা খুব উপভোগ করতাম। ভালো বই হলে ডুবে যেতাম তাতে সন্ধ্যাবধি। সন্ধ্যার আগেই ঘর অন্ধকার হয়ে যায়, ইচ্ছে থাকলেও তখন আর পড়া যায় না। আস্তে আস্তে সবাই ঘরে সন্ধ্যাবাতি জ্বালিয়ে দিত। বাতির আলোয় পড়ার ইচ্ছাটা তখন আর থাকতো না, তদুপরি একটু বিরতি নেয়ার প্রয়োজনও পড়ত। বইটা সেখানে রেখে আস্তে করে বেড়িয়ে পড়তাম। বইয়ের চরিত্রগুলো মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে।  বাড়ির উঠানে হেঁটে কিছুক্ষণ পর বাড়ির লতা-গুল্ম আর গাছ-গাছালি ছাওয়া আমাদের বিশাল বাড়ির ছবিকে তুলি আর রঙের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলি ক্যানভাসের গায়। শীতকালে যখনে উত্তুরের কনকনে হিমেল হাওয়া বইতো, স্নানের আগে বাড়ির দরজার পুকুরের পূর্ব পাড়ে আমরা রোদের আলোয় এলিয়ে দিতাম গা। শীতকালের কাউয়া স্নান সেরে (কাউয়া স্নান হলো এমন এক ধরনের স্নান যাতে জলে একটি কি দুইটি ডুব দিয়ে পুকুর থেকে দ্রুততম সময়ে উঠে আসতে হয়। এই স্নানে শরীরের কোনো না কোনো অংশ না ভিজলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কাকদের স্নানের সাথে এর কিছুটা মিল আছে বলে এই ধরনের নামকরণ) স্নান সেরে আবার রোদে আলোয় নিজেদের নিতাম উষ্ণ করে। এই উত্তরের হাওয়া পুকুরের জলয়ে সৃষ্টি করত এক অভাবনীয় শিল্পকলা। জলের ঢেউয়ে রোদের আলোয় চিক চিক করত, রাতের আকাশ যেন নেমে আসত পুকুরের জলে, হাজারো তারার ঝিকিমিকি আলো মন ভুলিয়ে দিত। রোদের আলোয় ঢেউয়ের ওপর ঝকমক করতো লক্ষ লক্ষ হীরার কণা, সেই আলো ঝলমল জলের দীঘল পুকুর, আমাদের সবুজ ছায়া-সুনিবিড় শান্ত গ্রাম, আমাদের ফেলে আসা সোনালু ফুলের মত লকলকে শৈশব যা আজ স্মৃতির গহ্বরে ক্রমশ অপসৃয়মান, সব কিছুকে, ইচ্ছে করে আজ,  প্রিয় সব বর্ণমালার ঠাসবুনটে তুলে ধরি। কালো কালো অক্ষরে মূর্ত করে তুলি সব। এখনো, একটু চোখ বন্ধ করে যদি ফিরে যাই সেই বালক বেলায়, দেখি বাড়ি ভর্তি মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছে, কানে বাজছে সবার কথা। হেমন্তে সারা বাড়িতে ধান আর খড় ছড়ানো থাকতো। সেখানে আমাদের শৈশব, আমাদের কৈশোর উত্তরের হিম বাতাসে ওড়া ঘুড়ির মতন উড়ন্ত ও জীবন্ত থাকে সেরূপ আমরা সবাই প্রাণবন্ত হয়ে হেসে খেলে বেড়াবো। সেখানে প্রোথিত থাকবে বেদনা বিধূর গান, থাকবে হাসি-কান্না-উৎসবের দৃশ্য, সেখানে অপাপবিদ্ধ আমরা হুটহাট করে বড় হবো না, সেখানে সময়-কাল থমকে থমকে যাবে। 

আপনারও তো ছিল চমৎকার লেখার হাত, ঝরঝরে গদ্য লিখতেন, লিখতেন হৃদয়ছোঁয়া কত কবিতা! ছবিও আঁকতেন বেশ ভালো! দৈনিক রূপালীর সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত আপনার কবিতাদের আলতোভাবে ছুঁয়েছি কতশত বার! পত্রিকার পাতা থেকে ওঠে ওরা বেড়াত ঘুরে চারপাশ! তখন আমি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম, সাহিত্য পাঠের একটা ঘোরা-লাগা নেশা ক্রমশ আমাকে আচ্ছন্ন করে তুলছিল, ছাপার অক্ষরের বাংলা বর্ণামালাদের প্রতি তৈরি হচ্ছিল অব্যাখ্যেয় এক দরদ, গল্প-কবিতা-উপন্যাস, দৈনিক থেকে মাসিক যে কোনো পত্রিকা পেলে আমি নাওয়া-খাওয়া ভুলে যেতাম। দোকান থেকে কেনা নতুন শাড়ির ভাঁজ খোলার সময় ভেতরে থাকা আনকোড়া মচমচে পুরনো পত্রিকার পাতাটির টুপ করে পড়ে যাওয়াটা আমার কাছে ছিল পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্য! সেটা সযত্নে হাতে তুলে নিতাম, খুব আয়েশ করে পড়তাম, হারিয়ে যেতাম কালো কালো সব শব্দমালার গভীরে। আর সেটা যদি হত সাহিত্যপাতা কিংবা বিশেষ সংখ্যা তাহলে সে সুখ দ্বিগুণ হতো। মৌলভী বাজারে একটা ক্লাব ছিল সেই সময়, স্কুলে প্রবেশের আগে এবং ছুটির পর সেখানে একবার ঢুঁ মারাটা ছিল আমার কাছে তীর্থ দর্শনের মত, সেখানে রাখা পত্রিকাগুলোতে একবার চোখ বুলাতে না পারলে মনে হত কত কিছু যে হারিয়ে ফেললাম! আমাদের বাড়িটা কিছু দিনের জন্য খুব অন্যরকম হয়ে ওঠেছিল, সম্ভবত আশির দশকের শেষের দিকে। খুব সাহিত্য-চর্চা হতো তখন, হতো গান-বাজনাও। বাড়ির দরোজায় সমাধির পিছনে, পুকুর-ঘাটের দক্ষিণে তৈরি করেছিলেন একটা বড় ফুলের বাগান, গন্ধরাজ ফুলের ঘ্রাণে সারা বাড়ি মৌ মৌ করত, দরজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক অদ্ভুত মাদকতায় পেয়ে বসতো। ইচ্ছে করত সারা দিনমান এই পথ ধরে চলতে থাকি। গোলাপেরাও ছিল, হেসে ছিলে সেখানে, গোলাপের গন্ধটা ছিল মিষ্টি ও তীক্ষ্ণ। বাগানের এক কোনায় একটা সাইনবোর্ড ঝুলতো যেখানে খুব কাব্য করে কিছু কথা জুড়ে দেয়া হয়েছিল ফুল না ছেড়ার জন্য। ‘পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না, পরের জন্য তোমার হৃদয়-কুসুমকে প্রস্ফুটিত করিও’ – এ-রকম কিছু কি? 

স্মৃতিরা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে!  

পুরো বাড়ির সদর-দরজা জুড়ে - একেবারে নোয়াঘরের পেছন থেকে রাস্তা পর্যন্ত লাগানো হয়েছিল অনেকগুলো কৃষ্ণচূড়া গাছ, সারি সারি, ফাল্গুন-চৈত্রে যখন সারা গাছ জুড়ে থোকা থোকা ফুলেরা ফুটত, যেন আগুন লেগে যেত আকাশের গায়, রক্তলাল সেই দৃশ্য দেখতে পথ-চলতি লোকজন থমকে দাঁড়াতো। তখনো আমাদের ছোট্ট দ্বীপে কৃষ্ণচূড়ারা এত বিখ্যাত হয় নি, বোধ হয় চট্টগ্রাম থেকে কেউ এনেছিল চারা বা বীজ। আমাদের বাড়িতে সেই আশির দশকে এসেছিল সাদা-কালো টেলিভিশন, এসেছিল ৫১২ মডেলের (মডেল ভুলও হতে পারে) ন্যাশনাল টেপ-রেকর্ডারও। মান্না দে-র গান বাজত, ‘এখনো কি প্রথম সকাল হলে/ স্নানটি সেরে পূজার ফুল তুলে/ পূজার ছলে আমারই কথা ভাবো/ বসে ঠাকুর ঘরে’,- গানের কথাগুলো ভালো লাগতো কিন্তু এর গভীর অর্থ বোঝার বয়স হয় নি তখনো, আরো বাজতো সাগর সেনের রবীন্দ্র সঙ্গীত – কি যে মধুরতা ছড়িয়ে পড়তো সারা বাড়ি জুড়ে; ‘খেলিছ এ বিশ্বলয়ে বিরাট শিশু/ আনমনে’ অনুপ জলোটার ভরাট কণ্ঠের এসব গানের কিছুই বুঝতাম না, শুধু ‘বিরাট শিশু’ শব্দবন্ধ কানে বাজত আমাদের, আমরা ছোটরা যার বড়দের আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম সারা দিনমান, আর অবাক বিস্ময়ে তাদের কার্যকলাপ দেখতাম। আহা, সে এক অদ্ভূত অন্যরকম মোহজাগানিয়া দিন ছিল আমাদের! অতঃপর আপনারা একে একে সবাই বাড়ি ছাড়তে শুরু করলেন চাকুরি কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য। 

বাড়ি আস্তে আস্তে শূন্য হতে থাকলো, উদ্দাম-উচ্ছ্বল বাড়ি কীভাবে যেন ম্রিয়মান হয়ে যেত, উল্লাসেরা কোথায় যেন মুখ লুকোত, গম-গম করা বাড়িকে এক অন্যরকম নির্জীবতায় পেয়ে বসতো। শুধু পার্বণে, উৎসবে সবাই যখন ফিরে আসতো, সারা বাড়ি আবার উদ্দীপ্ত হয়ে উঠতো। বাড়ির গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালিরা হয়তো সে আনন্দে ভাগ বসাতো, সবার মধ্যে অন্যরকম প্রাণ-চাঞ্চল্য এসে যেত। সাহিত্য-মনস্ক, শিল্প-মনস্ক খুব বেশি মানুষ ছিলো না বাড়িতে, যারা ছিলো তারা বড় হতে হতে জীবিকার টানে বাণিজ্যে নিমঘ্ন হয়ে গেল, লক্ষ্মীর প্রতি বাড়াবাড়ি দেখে অগোচরে স্বরস্বতীও মুখ লুকোলো। শিক্ষা-দীক্ষায় অজপাঁড়াগাঁয়ের আমাদের সেই বাড়ির বেশ নাম ছিল, কিন্তু কি এক অভিমানে আপনারা দূরে সরে গেলেন, প্রিয় বাড়ি থেকে আপনাদের ছায়ারাও উড়াল দিল, নতুনরা অনুভব করলো না পুরনোদের তীব্র-তীক্ষ্ম সংবেদি অস্তিত্ত্ব। বড়দের মুখে মুখে আপনাদের কথাও আস্তে আস্তে কমতে কমতে প্রায় নাই হয়ে গেল। কালে-ভদ্রে বললেও সেটা হয়তো আর কারো মনে আগের মত দাগ কাটত না। নিজের ভেতরে অকস্মাৎ জেগেছিল ছিল যে আগ্নেয়গিরি, যার লাভা সব ছিড়েফুঁড়ে বের হতে যাচ্ছিল, কী এক দক্ষতায় সেটাকে স্তিমিত করে দিলেন, সেই ছাঁই-চাপা বুদ্ধুদ, আজ কেমন আছে কে জানে! 

কী হারিয়েছেন যদি দেখতে চান, চোখ বন্ধ করে ভাবুন, আমাদের গ্রাম, তবে -  

কটু হেঁটে আসুন আমাদের বাড়ির উঠোনে, 

দেখতে থাকুন শুনশান বাড়ির মধ্যরাতে মধ্যাকাশে

ঘোর-লাগা শুভ্র-সাদা অপার্থিব গোলগাল চাঁদ, 

মৃদু বাতাসের হিমকে গায়ের রোমে ঘুমুতে দিয়ে 

একটু উত্তরে নুয়ে, বিবর্ণ মলিন নাক-মুখ-বুক পেতে দিন, 

উঁহু! রৌদ্রস্নাত মাটির সোঁদা ঘ্রাণ নয়, আরেকটু উত্তরে সরে আসুন, 

দুই-একটা ঝরে-পড়া-ফুল হাতে তুলে নিন, বাতাসকে অনুভব করুন, 

বুকের অলিন্দে খুঁজে দেখুন,

সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে শিউলি ফুলের একরাশ মন উদাস করা

অপরূপ, হালকা, অমৃত সুঘ্রাণ!!

(শরতে শেফালীরা যখন আমাদের উঠোনে নেমে আসে)

দুই-একটা ঝরে-পড়া-ফুল হাতে তুলে নিন,

বাতাসকে অনুভব করুন,

বুকের অলিন্দে খুঁজে দেখুন, 

সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে অগুনতি শিউলি ফুল!

আর একরাশ মন উদাস করা 

অপরূপ, হালকা, অমৃত সুঘ্রাণ!! 

===========================

এপ্রিল, ২০২১ করনোক্রান্তিকাল, 

বনশ্রী, ঢাকা

1 টি মন্তব্য: