আর একটু পরে অন্ধকারের কালো রঙের সাথে মিশে যাবে গোধূলির কমলা রঙের স্স্নিগ্ধ আলো। এই অপার্র্থিব সন্ধ্যা, এই মন খারাপ করা বিষন্ন বিকেলগুলো আর ফিরে আসবে না আমার জীবনে। তিন বছরের অধিককাল কাটিয়েছিলাম লালমাটির দেশ কঙ্গোতে। ঘুরে বেড়িয়েছি আফ্রিকার আরো অনেক অঞ্চলে।
খুব ভারাক্রান্ত মন নিয়ে এবারের পূজার সময়টা কাটাতে হলো। গত তিন বছর যাবত প্রবাসী হলেও প্রতি বছর এই সময়টা দেশে কাটানোর সুযোগ পেতাম। শরতের নীলাকাশ, সাদা ধবধবে কাশফুল, শিউলি ফুলের সুবাসভরা ভোর আর ঢাকঢোলের আওয়াজে দেবি দূর্গার পদভারে কম্পিত চারপাশ আমার মনের মধ্যে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দিত, ছোট বেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যেত খুব।
নিজের হাসপাতালে মুকওয়েগে। ছবিটি উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া।
অনেক দিন ধরে ডেনিস মুকওয়েগে-কে নিয়ে লিখবো ভাবছিলাম। প্রথম যখন তাঁর কথা জানতে
পারি বিভিন্ন সংবাদ পত্র ও কঙ্গো-র স্থানীয় কিছু রেডিও-র মাধ্যমে, আমার কৌতুহল
বেড়ে যায়। সেই থেকে এই মানবতাবাদী ডাক্তার এর সম্পর্কে যে কোনো সংবাদ খুব আগ্রহ ও আন্তরিকতার
সাথে পড়ার ও শোনার চেষ্টা করতাম।
মাঝে মাঝে যখন খুব মন খারাপ থাকে, রুম থেকে বেরিয়ে পড়ি। কিছু কিছু বিকেলে খুব বিষণ্নতা পেয়ে বসে। রুম থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি।কালো-সাদা কাকের উড়াউড়ি দেখি। আকাশেরঅনেক উঁচুতে দেখা যায় আমার মতই দু-একটা নিঃসঙ্গ চিল। আমার কিছুই ভালো লাগে না।
মানুষ আসলেই এই পৃথিবীর সব চেয়ে অবাক করা
প্রাণী। বুদ্ধিতে তারা ছাড়িয়ে গেছে অন্য সব প্রাণীকে। বোকামিতে শ্রেষ্ঠতার উদাহরণ
টানলে সেটাও মানুষের দিকে যাবে। নৃশংতায় এই মানুষের সমকক্ষও কেউ নেই, যেরকম
ত্যাগে ও ভালোবাসায়ও তার সমকক্ষ পাওয়া দুষ্কর।
অনেকদিন পর গেলাম প্রিয় ক্যাম্পাসে। প্রায় ১ বছর পর আফ্রিকা আর ইউরোপ ঘুরে নিজের দেশে পা দিলাম। প্রিয় এক বন্ধুকে নিয়ে রওনা দিলাম ক্যাম্পাসের পথে। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছি প্রায় বছর চারেক হলো। বছর তিনেক আগে একবার গিয়েছিলাম সার্টিফিকেট তুলতে। অনেক দিন পর আবার খুঁজতে গেলাম পুরনো সেই দিনগুলোকে। দিনটি ছিল ১৬ অক্টোবর ২০১২।
ওঁরা কখনোই ঠিকমত সম্মানও
পায় নি। যদিও ওঁরা কখনো লালায়িত ছিল না খেতাব বা পদবী-র জন্য, লোভ ওদেরকে কখনো গ্রাস করে নি। দেশকে সত্যিকারভাবে
ভালোবাসতো ব'লে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ
করেছিল মাতৃভূমিকে হানাদার-মুক্ত করার জন্য।
রুমে ফিরে মোবাইল
ফোন হাতে নিয়ে অবাক হলাম। অনেকগুলো মিসড কল দেখাচ্ছে। নাম্বারটা দেখে মনে পড়ল আজ
জঁভিয়ের এর দেখা করতে আসার কথা ছিল।
প্রতিদিনের মত
আজো রুমে মুঠোফোনটা রেখে অফিসে চলে গিয়েছিলাম।জিনিসটার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়ার
যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। এই দূরদেশে সচরাচর কারো ফোন পাওয়া বেশ বিরল ঘটনা। কালে
ভদ্রে দেশ থেকে দুই একটা কল যে পাই না তা নয়,
কিন্তু কখন সেই রিং টোন বাজবে আর তার আশায় সারাদিনমান এই
মূর্তিমান সমস্যাটাকে পকেটে বহন করার কোনো মানে হয় না।
আমার চোখে ভেসে
উঠলো বিষণ্ন এক যুবকের ছবি। জীবন সংগ্রামের ক্লান্তি আর বেদনা যাকে নিঃশেষ করে
দিতে চাচ্ছে।